লুৎফুল হোসেনের তিনটি কবিতা

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 25 Apr 2019

2615 বার পড়া হয়েছে

Shoes
লুৎফুল হোসেন

 

 

সাতরঙা বেদনার উৎসব দূরবর্তী মেঘ আমার প্রসের্পিনা
স্মৃতির পাতারাও শুকিয়ে ঝরে যায়
অতঃপর হাওয়ায় মিলায়,
বৃষ্টির জলধারা ছুঁয়ে দিলে ফোঁটায় ফোঁটায়
অমিয় মেঘের খেয়ালি ইচ্ছায়
তেতলার বারান্দার সীমানায় ঝুঁকে পড়া
শুকনো মেহগনিও
আড়াল করে অনতিদূর
সোনালু ও কৃষ্ণচূড়ার জেগে ওঠা শরীর
তার ঋতুদাক্ষিণ্যের বাহার,
ক্ষণস্থায়ী সুখেরা আমার তবু
কখনো ফিরে আর পুনর্জন্ম নেয় না,
কাহারো চকিত দৃষ্টির ছুরি
ছুঁড়ে দেয়া দু'এক প্রহর অনুত্তরের কৃপায়
যদিওবা
ক্ষণিক ধরা দেয়, অতঃপর - লহমায় হারায়।কার্নিশে পাখিদের সভায়
আমার খোয়া যাওয়া স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসার মতো
নগন্য এজেণ্ডা নিয়ে
অনুপস্থিতির ফর্দ লেখা হয়
রোজকার অনুপুঙ্খ মাইন্যুটসে,
শোক সন্তাপ নিয়ে কথা হয়
কিছু মৃদু অনুকম্পা
না, ওটুকুও কখনো হয়না;
অদৃশ্য চিঠির ঝাঁপিতে জমে থাকা
অগণিত চিঠির সম্ভার ভুল করে একদিনও
মাড়ায়না ডাকঘরের আঙিনা -
আমিও সেইমতো অপেক্ষায় থাকিনা,
সূর্যোদয় সূর্যাস্তের খুনসুটির
পরিসংখ্যান রাখিনা,
অথচ মেঘেদের গায়ে গায়ে সময়
ঠিক ঠিক পেয়ে যায় যাবতীয়
বিবমিষা, বিভ্রমের কোলাজ সখ্যের
সনির্বন্ধ লহরী - সর্বজ্ঞ কীর্তন।এইসব জেনেছি বলেই
একাকিত্ব নির্ভুল হলেও - সখ্য মানে
প্রখর ভুলের ঝকঝকে পোর্ট্রেট,
মানি।
সিনোনিমসে আমি মানে জলরঙ ক্যানভাস জুড়ে
আদ্যোপান্ত বৃষ্টিজলে নিমজ্জমান মাশুল,
জানি।
ভালোবাসা মানে শোকেসে সাজানো
সারি সারি অনিরাময়যোগ্য অসুখ।স্বভাবের আকর্ষি উপমা - নির্ভরতার দিন তাই
এক বিন্দু হিসাবেও রাখে না আমায়;
আজানের সুর, পূজার ঢাক, প্যাগোডার প্রণতি,
গীর্জার সোচ্চার ঘন্টা প্রশমিত করে না
বিহ্বল কণ্ঠস্বর চুঁইয়ে প্রবহ বেদনার প্রপাত,
দৈবও কখনো ভাবেনা
কোন কথা - কতটুকু তার বলা ঠিক,
বলাটা উচিৎ;
প্রভূও নিজ হাতে গুনেগেঁথে আমাকে দিয়েছে কেবলি
উপেক্ষা আর অপেক্ষার
নিরন্তর ঢেউ, সমুদ্রের শরীর ভাঙা স্মৃতিসঙ্গম,
শান্তসমীর মুড়ি দেয়া নিস্তরঙ্গ বালুতট;
যেখানে কোনোকালে পৌঁছোয় না প্রতীক্ষার জোয়ার,
যে তল্লাটে প্রতি লহমায় লেখা হয়
শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসার পরিপূর্ণ ক্ষয়,
নকশীতে গাঁথা হয় অন্তর্গত প্রেমের যতিহীন মুশায়রা;
কেউ কেউ জানে -
ওইখানে আদপে কোনো নৌযান
কোনোকালে ভুলেও ভিড়বে না, ফেলবেনা ছায়া;
অথচ এইটুকু সত্যও কৃপা করে দৈব কখনো বলেনা।কণ্ঠে ফণা তুলে দুর্বোধ্য কথার আদলে
কেবলি হিসহিসিয়ে উঠছে যে বিষধর শব্দগ্রন্থিরা
তার কোনো নির্মাণ গুমোট বৈশাখেও
মৌসুমি বাতাসের মতোন পাক খেয়ে ওঠে না ধেয়ে,
কখনো হয়না খানিক বাউল,
সামান্যতম উৎসবমুখরতায় উন্মুল;
বিষাদের তো কোনো ঋতু নেই
বিষণ্ণতার নেই যেমন সামান্যতম যৌগিক অস্তিত্ব,
দুঃখ তো সেই সুগভীর বিন্দু
যে ডুবে যেতে যেতে অতলান্তিকের অপার সীমান্তে
নেমে গেছে এমনই গভীরে -
নাম না জানা হাজার গুল্মের
বর্ণিল সেই সুরম্য র‍্যাকে, যেখানে তুমি
বনসাই করে ফেলে রেখেছো অবজ্ঞার অশ্বত্থ,
আর একমাত্র সেখানেই
নিজ হাতে সেই প্রথম ও সেই শেষবার
তুমি লিখেছিলে আমার নাম
উপেক্ষার উৎপ্রেক্ষায়, অনভ্যস্ত হাতে।অন্ততঃ ওইটুকুনও তো একদিন দিতে পারতে
অবহেলার শেষ দৃশ্যে ক্ষণিক এসে,
ডাকপিওনের হাতে তুলে বলতে নাহয়
পৌঁছে দিতে আমার ঠিকানায়।এইটুকু জেনেছি বলে তবু
বুকের বদ্বীপে লেগেছে অমিয় পলির প্রলেপ,
সংগোপন একান্ত নৈঋতে -
সুখ এসে ছুঁয়ে গেছে এক বিন্দু উঠোন,
একটুখানি মাটি আমার আঙিনায়
যত্নে বুনেছে বিষধর ছোবলে মৃত্যুর মতো সম্মোহন।

জানতে হলে উচিৎ ছিলো
উঁচু কোথাও উঠে দাঁড়ানো
যেখান থেকে দেখতে পাওয়া
যেতো ভালো,
টিকিট কাউন্টার এক প্রান্তের গ্রন্থবিতান
প্ল্যাটফর্মের ঠিক মাঝখানে
জমজমাট চায়ের স্টল
তার একদিকে দড়িতে ঝোলানো আগুন
অন্যদিকে পানপাতার খোলা
ক্যানভাসে
লাল কমলা দানার বিস্তারে
ছড়ানো
খলবলানো ফাগুন,
ঠঙঠঙ করে ঝোলানো টুকরো
রেলের পাতে
ট্রেন ছেড়ে যাবার ঘন্টা
বাজাতে
অপেক্ষমাণ রেলকর্মী
কেউই চোখ এড়ায়নি
এমন কি ভীড় করে ছুটতে থাকা
আসাযাওয়ার যাত্রীদের মাঝে
বিষণ্ণ বৃদ্ধ - হয়তো তার
ছেলে কিংবা মেয়ের
আসবার কথা যেই ট্রেনে ওটা
আসেনি তখনো,
লম্বা করে ঘোমটা টানা
গোলাপী জড়িদারে
কান্নার লাগাম খোলা বৌটি
বিদায় জানাতে এসেছে যে
সদ্য বিয়ের পিঠাপিঠি
কোনো এক দিনে
তার নতুন স্বামীকে আজই
প্রথম বার,
বিশাল কামরা নিয়ে
বসে থাকা স্টেশন মাস্টার
বাতাসে দোল খাচ্ছিলো
দরোজায় পর্দা যার,
কাঁধে টায়ারের চাকা নিয়ে
হাতে একখানা কাঠি
ছুটতে ছুটতে এখানে এসে
থমকে আছে
বিষাদের ছায়া মাখা যে কিশোর
কোনো এক ট্রেনে চেপে সুদূরে
যাবার
কুয়াশাচাপা সাধ ছিলো
অপার;
অথচ তোমাকে দেখিনি
কোথাও, আসবার কথা ছিলো -
কতোকাল অপেক্ষায় গেছে
স্টেশনের ঢালাই বেঞ্চিতে বসে
জীবনের তিন তাসের টেক্কারা
নেমে গেছে
হয়তো কোনো অচেনা
স্টেশনে
একে একে সবটুকু সময়
উড়ে যাচ্ছে আকাশভর্তি
মেঘের সীমান্তে,
ওরা হয়তো মিলবে কোথাও
দিগন্ত দৃষ্টির ওপারে
দূরবর্তী কোনো স্টেশনে
মখমলি আলোয়ানে স্পর্শের
সীমানা ঢেকে
সামান্য লাগেজে জীবন গুটিয়ে
নিয়ে
তুমি হয়তো উঠতে যাচ্ছো
অন্য কোনো ট্রেনে
আরও দূর কোনো গন্তব্যের
উদ্দেশে
অচেনা অন্য পথে
অন্য দেশ অন্য মেঘ
অন্য আকাশ ছাওয়া কোনো
বৃষ্টির সিথানে।

পাঁজরে সেলাইয়ের দাগ
দেখিয়ে
বলছো খোয়া গেছে কিছু!
চোখের বিষণ্ণতায় মেলে ধরে
কাজলের মতো গাঢ় এক
আঁধার প্রলেপ
নিমীলিত পাতাদের পরতে
পরতে
লিখে রেখেছো অগণিত
বিষাদের
পুঙখ গল্প! নাহোক সবটুকু
তার
আদ্যোপান্ত, জেনে গেছি
দিবসের পিঠে
লুকোনো অমাবস্যার অন্তত
অর্ধেক।
কব্জিতে কাটা দাগ স্মৃতিবহ
দগদগে ক্ষত
স্বচ্ছ জলের মতো অনায়াস
বলে ওঠে
পুরুষ পুরুষ ধরে অনিচ্ছুক
দাসত্বের
দহন পীড়ন অতীত সব
গল্পগুলো অবিরত।জন্মদাগ জরুলের মতো
বুকের ভিতরে
তোমার জমিয়েছে লোবান
পোড়া ছাই,
ধূম্র কুট শলাকার গায়ে নিভন্ত
ও বাড়তি
অঙ্গারের মতো যদি ঝেড়ে
ফেলা যেতো
মনবাগানের প্রান্তর জুড়ে
বেড়ে ওঠা অশ্বত্থ
বা বটের বিস্তারে ডানা মেলা
সেইসব
প্রগভীর বেদনার যতন
ন্ধুক - বনসাই;
গাঢ় সবুজাভ সমুদ্র নীল ঢেলে
আমিও
আঁকতাম কোনো বিখ্যাত
চিত্রকর্মের
আদলে তোমায় আর
ভালোবেসে নাম দিতাম
'বিয়েতা বিয়াত্রিচ' কিংবা
ধরো 'প্রসের্পিনা'।

 

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199