আমরা করবো জয়

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 2 Jan 2025

2050 বার পড়া হয়েছে

Shoes
নাজনীন হাসান চুমকি
নাজনীন হাসান চুমকি


“সবাইকে স্বাগতম.. আজকের এফজিডি মানে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন-এ আপনারা বিভিন্ন বয়সী এবং বিভিন্ন স্ট্যাটাস-এর নারীরা আছেন.. কিন্তু আপনাদের সকলের টার্গেট ‘এক এবং অভিন্ন’.. বেগম রোকেয়াকে বলা হয় নারীর অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ..” কথাগুলো বলতে বলতে থমকে যায় রাইসা, রাইসা রহমান। বিদেশী একটা এনজিও-তে কাজ করা রাইসা রহমান ঘরে বসেই “নারীর আত্মনির্ভরশীলতা” বিষয়ে এফ.জি.ডি শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ থমকে গিয়ে, তার চোখ ঘুরতে থাকে ল্যাপটপের পুরো স্ক্রীনে। রাইসার সহকারী পাপড়ি রাইসাকে চুপ থাকতে দেখে প্রশ্ন করে “আপা কোন সমস্যা..? শরীর খারাপ লাগছে..?”
রাইসা মৃদু হেসে বলে “বাহ্ বারো জন..”
পাপড়ি রাইসার ভুল ভাঙানোর জন্য উত্তর দেয় “না আপা বিশ জন প্রশিক্ষণার্থী আজ..”
পাপড়িকে নয় যেন নিজেই নিজেকে উত্তর দেয় রাইসা “বারো জন হিজাব পরা..”
এবার সবাই নড়ে চড়ে বসে। হঠাৎ করেই রাইসার কণ্ঠস্বর রোবটের মতো হয়ে যায় “বারো জন আপা.. আপনাদের কাছে প্রশ্ন.. এখানে তো কোন পুরুষ নেই.. আপনাদের পরিবারেরও কেউ নেই.. ঈমান থেকে বলুন তো.. আপনারা কী সবাই সব ওয়াক্তের নামাজ আদায় করে ইসলামের সব বিধিনিষেধ মেনে চলেন..?”
সবাই চুপ। পাপড়ি বিষয়টি স্বাভাবিক করে তোলার জন্যে বলে “আপা.. আজকের বিষয় নারীর আত্মনির্ভরশীলতা..”
পাপড়ি কথা শেষ করার আগেই রাইসা তাকে থামিয়ে দেয় “উনাদেরকে উত্তর দিতে দাও পাপড়ি.. বলুন আপুরা.. নির্ভয়ে বলুন.. কেননা এই প্রশ্ন কিন্তু আমাদের আজকের বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত..”
হঠাৎ করেই একজন নারী বলে “আপনি এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন না.. এটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়..”
এক বিন্দুও বিচলিত না হয়ে রাইসা সুন্দরভাবে বলে “জি¦.. জানি আমি.. হ্যাঁ.. আপনাদের খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আপা.. কিন্তু আপনি এবং আপনারা শরীয়ত মোতাবেক হোক আর সৌন্দর্যের কারণে হোক.. যে কারণেই হোক না কেন, আগে জানতে হবে ‘কেন আপনি কি করছেন?’.. যদি এই প্রশ্নের উত্তর নিজেই না দিতে পারেন তবে সেই কাজটি করা ঠিক নয়.. নির্ভরশীলতার সঙ্গে যেমন ‘আত্ম’ যুক্ত আছে তেমন উপলব্ধির সঙ্গেও ‘আত্ম’  যোগ করলে হয় ‘আত্মোপলব্ধি’। যার আত্মোপলব্ধি বোধ আছে সে-ই পারবে আত্মনির্ভরশীল হতে.. অন্যথায় এই প্রশিক্ষণ নিয়ে কী লাভ..!”
খুব ছোট করে ভীত ছাত্রীর মতো অল্পবয়সী একটা মেয়ে হাত তোলে। পাপড়ি তাকে এবং তার নাম লক্ষ্য করে বলে “আনিকা ইসলাম, বলুন..”
মেয়েটা প্রথমে খুব গোপন কথা বলার মতো কণ্ঠস্বর নামিয়ে আস্তে আস্তে ভীত কণ্ঠে কথা শুরু করে “আমি এখনও স্টুডেন্ট.. না, সব ওয়াক্তের নমাজ আদায় করতে পারি না..” এটুকু বলতে বলতেই আনিকার কণ্ঠ বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে “কিন্তু একদিন শীতের সময় ঠান্ডায় স্কার্ফ পেঁচিয়ে গিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে.. আমার বন্ধুরা বললো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে.. ডিফরেন্ট লুক.. তারপর থেকেই আসলে..” কথা পুরো শেষ না করেই হি হি করে হেসে ফেলে আনিকা। যে হাসিতে, এমন একটা কথা বলে ফেলার মধ্যে লজ্জা আছে, তারপরও সে সত্য কথাটা বলেছে বয়সের কারণে।
রাইসা আনিকার এভাবে কথা শুরু করায় মুগ্ধ হয় “অসংখ্য ধন্যবাদ আনিকা এত সুন্দর করে সত্য কথাটা বলার জন্যে..”
সেই সময়ই পাপড়ি বলে “ফারহানা হক হ্যান্ড রেইজ করেছেন.. বলুন কী বলতে চান..”
অসম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর নিয়ে ফারহানা তার কথা শুরু করে “আমাদের এই ফ্ল্যাট-টা খুব ছোট্ট কিন্তু নিজেদের.. এটা কেনার সময় আমার বর তার বন্ধুদের কাছে লোন করে.. আমার বাবা কিছু টাকা দেয়.. শশুরও সাহায্য করেন কিন্তু তারপরও আমাদের বেশ কিছু টাকার কম পড়ে যায়.. তখন আমি আমার সমস্ত গহনা বিক্রি করে দিয়ে কিনি এই ফ্ল্যাট-টা.. এখন আমার ছেলে স্কুলে পড়ে..” সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ফারহানার কথা অথচ সে কথা শেষ না করে আচমকা থেমে যায়। তবুও কেউ কোন কথা বলে না অপেক্ষা করতে থাকে, আগের থেকে অনেক ধীরে আবার কথা শুরু করে ফারহানা “ওকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে বেশ লজ্জায় পড়ে যায়.. বাচ্চাদের মায়েরা কী দারুণ দারুণ গহনা পরে আসে.. পরে.. আমি লজ্জায় হিজাব পরা শুরু করি.. এতে হাত দু’টো ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না.. আর হাতে আমার বিয়েতে পাওয়া একটা দামী ঘড়ি আর আমার এনগেইজমেন্ট-এর আংটি থাকে.. বুঝতেই পারছেন আপা..” থেমে যায় ফারহানা চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে, নীরবে চোখ মুছতে থাকে। মাথা তুলতে পারে না কান্নার দমকে তার শরীর কাঁপতে থাকে। চোখের চশমার নীচ থেকে জল মুছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পাপড়ি বলে “আমীনা সুলতানা হ্যান্ড রেইজ সাইন দেখছি.. বলুন আপা..”
বোরখার সাথে হিজাব পরা আমীনা শ্যামলা রঙের ছোট্ট মিষ্টি মুখ। লিপস্টিকহীন চিকন ঠোঁটে সবসময়ই মৃদু হাসি। আমীনা শুরু করে তার বক্তব্য  “আমার পরিবারের সকল নারীরা হিজাব এবং বোরখা পরে.. আই মিন আমার বাবার বাড়ির সবাই.. বরং শশুরবাড়ির কেউ পরে না.. তারপরও আমি এই পোষাকেই কমর্ফোটেবল..”
রইসা একটা কাগজ ল্যাপটপ টেবিলে রেখে বলে আমীনার উদ্দেশ্যে বলে “আমীনা আপা আপনি তো ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং-এর উপর পড়াশোনা করেছেন.. এবং আপনি স্কুটি চালান..??
আমীনা আগের মতোই হাসি নিয়ে রাইসাকে উত্তর দেয় “জি¦.. বাচ্চার কারণে জব করি নাই.. স্কুটি চালিয়ে নিজেই বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসি, নিয়ে আসি.. এবং বলে রাখা ভালো পারতপক্ষে আমার এক ওয়াক্ততেরও নমাজ কাজা হয় না..” কথাগুলো বলতে পেরে আমীনা যেন অদ্ভুত এক আনন্দ পায়, যা তার মুখ দেখলেই বোঝা যায়। রাইসা খুশি হয়ে বলে “ভেরী গুড.. আসলে..” রাইসা তার কথা শেষ করতে পারে না তার আগেই হোসনে আরা বলে “আমি কিছু কথা বলতে চাই..”
পাপড়ির কণ্ঠস্বর এখন অন্যরকম যেন সে এক মজার খেলা খেলছে। অতি উত্তেজিত হয়ে রাইসা কিছু বলার আগেই সে বলে “জী আপু বলুন.. আর প্লিজ যখন কেউ কথা বলবে অন্যরা সবাই মাইক্রোফোন মিউট রাখুন.. শুরু করুন হোসনে আরা আপু..”
বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় হোসনে আরা যেন বুকের মধ্যে যাওয়া নিঃশ্বাসটুকু তার সাহস “আসসালামু আলাইকুম.. আমার নাম হোসনে আরা.. আমি যে অফিসে জব করি.. সেখানে আমরা মোটে ছয় জন নারী.. আমি আমার পছন্দসই পোষাক পরেই অফিসে যেতাম কিন্তু সেখানে চারজন আপু ছাড়া আমরা... মানে আমি আর আমার ফিমেল সহকর্মী দুইজনকে সবাই কীভাবে যেন দেখতো.. কানাঘুষা করতো.. পরে একদিন দেখি ঐ আপুটাও..! নিজেকে কেমন যেন ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতো.. সবাই আমাকে দেখে হাসতো.. তারপরই..” কথাটা বলেই হোসনে আরা কেমন যেন ভাল বোধ করে, তেমনি মুষড়েও পড়ে। সবাই চুপ। এই বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে বসে ভার্চুয়ালি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করলেও বিশ জন নারীর সকলেই যেন তাদের প্রতিটি কথার ভাল-মন্দ, ব্যথা-বেদনা অনুভব করতে পারছে, তাই যেন সকলে চুপ হয়ে যায়। রাইসা হোসনে আরাকে প্রশ্ন করে “হোসনে আরা আপা আপনার স্বামী কিছু বলেননি..?” এবার জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে যাকে বলে দীর্ঘশ্বস ফেলে হোসনে আরা উত্তর দেয় “কী বলবে..! দুজনে রোজগার না করলে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে আপা.. তাই এই বিষয় নিয়ে তার কোন মাথাব্যথায় নেই.. থাকলেও হয়তো প্রকাশ করেনি.. আর আমাকে কিন্তু বাসে যাতায়াত করতে বেশি.. হিজাব থাকলে পুরুষদের চোখেও..” হোসনে আরা কথা শেষ করে না। হয়ত হিজাব ছাড়া তার দিকে পুরুষদের চাহনি মনে পড়ে যায়। মুখটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। আবারও সবাই চুপ। রাইসা কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে শুরু করে “যা বলছিলাম.. বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত.. নারী জাগরণের পথিকৃৎ.. তিনি সংসার সামলেছেন.. সন্তান লালন পালন করেছেন.. নিজে লেখাপড়া করেছেন.. এবং লিখেছেন.. কোন ছবি দেখেছেন বেগম রোকেয়ার যে ছবিতে তাঁর মাথায় কাপড় নেই..?” মেয়েরা সবাই মাথা নাড়িয়ে না বলে। আবার শুরু করে রাইসা “জী.. অন্তঃপুরে থাকলেও তিনি মাথার কাপড় ফেলেননি.. সুফিয়া কামাল যাঁকে বলা হয় আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা.. তিনি ভাষা আন্দোলনে.. গণঅভ্যুত্থানে.. অসহযোগ আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন.. তিনি বিভিন্ন দূর্যোগে ছুটে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়.. কই উনাকেও তো কোন ছবিতে যেহেতু মাথায় কাপড় ছাড়া দেখিনি..! নিশ্চয়ই উনার মাথায় সবসময়ই কাপড় থাকতো তাই ছবিগুলোতেও মাথায় কাপড় তোলা.. জাহানারা ইমাম..” নাফিসা নামের একজন তার মাইক্রোফোন আনমিউট করে প্রশ্ন করে “আপনি কী বোঝাতে চাইছেন আপা..? হিজাব পরা ঠিক না..?”
বিনয়ের সাথে পাপড়ি নাফিসার কথার প্রত্যুত্তরে বলে “রাইসা আপার কথা শেষ হয়নি নাফিসা আপা..”
নাফিসা কর্কশ কণ্ঠে বলে “আমরা কর্মশালা করতে বসেছি হিজাব বর্জনের লেকচার নয়..” নাফিসার এমন উষ্মা প্রকাশে বিব্রত বোধ করার কথা রাইসার কিন্তু সে উল্টো খুব ঠান্ডা ভাবে নাফিসাকে বোঝানোর চেষ্টা করে “আপা দেখুন..”
নাফিসা আরও ক্ষিপ্ত হয় “দেখার কিছুই নেই.. অনেকক্ষণ তো আপনার কথা শুনছি.. আমরা এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আপনার কোর্স করতে এসেছি, প্রত্যেকেই কীভাবে স্বাবলম্বী হতে পারি..”
পাপিয়া বিষয়টাকে সামাল দেবার জন্যে মাইক্রোফেন আনমিউট করে “ভুল করলেন নাফিসা আপা.. স্বাবলম্বী নয় আত্মনির্ভরশীল..”
নাফিসা পাপিয়াকে পাত্তা না দিয়েই শুরু করে কথা “ঐ হলো.. যা লাউ তাই কদু.. তো এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছি বলে কী আপনি আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া শুরু করবেন..?”
লামিম নামে একজন প্রশিক্ষণার্থী নাফিসার কথা হতেই কাঁটা কাঁটাভাবে স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করে “মানুষের অনুভুতিতে যখন আঘাত দিয়ে পঙ্গু বানিয়ে ফেলা হয় তখন তাকে কী বলবেন নাফিসা আপা..?”
রাইসাদের অর্গানাইজেশনের আয়োজিত ভার্চুয়াল কর্মশালার প্রত্যেকেরই তখন লামিমের দিকে দৃষ্টি। শুধু কালচে খয়েরী রঙের বসে যাওয়া চোখ জোড়া ছাড়া মেয়েটার আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটা চেয়ারে বসে থাকা মেয়েটার স্বাস্থ্য কেমন, সেটাও বোঝার উপায় নেই। কেননা, বোরখার কারণে চেয়ারে বসে থাকা মেয়েটাকে একটা পিচঢালা সোজা রাস্তার মতো সরলরেখা মনে হয়। প্রসঙ্গ অন্যদিকে মোড় ঘোরানোর জন্য পাপড়ি বলে “রাইসা আপা আপনি তাহলে শুরু করুন..” রাইসা তার বক্তব্য শুরু করার আগে এক ঢোক পানি পান করার জন্য গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়াতেই লামিম অদ্ভুত এক কণ্ঠে কথা শুরু করে। কথা বলার সময় তার শব্দচয়ন খুবই স্পষ্ট কিন্তু একটু খেয়াল করলে বোঝা যায় সে খুব সচেতনভাবে কথা বলছে “আমি লামিম হাবিব.. বাবা মায়ের তিন কন্যার ছোট কন্যা আমি.. বড় বোন নিজের পছন্দমতো পালিয়ে বিয়ে করে দেশের বাইরে সেটেল.. বড় মেয়ের মতো মেঝ মেয়ে যেন কোন র্দুঘটনা না ঘটায় সেই ভয়ে মেঝ আপার থেকে পঁচিশ বছরের বড় ধনী পাত্র দেখে বাবা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেন.. এবং আমাকেও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে দেয় কলেজে পা রাখতেই..” তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে নাফিসা বলে “মানুষ ঠিকই বলে.. দশটা মেয়েমানুষ এক জায়গায় মানেই গীবত শুরু.. অনলাইনেও দেখি একই ঘটনা.. এখনি নিশ্চয়ই শশুরবাড়ির বদনাম” নাফিসাকে পাত্তা না দিয়ে লামিম বলতে থাকে “সম্ভ্রান্ত পরিবার মানে একদম বনেদী সম্ভ্রান্ত পরিবার.. যে পরিবার আদেশ এবং হুকুম করে.. অনুরোধ নামক শব্দ এই পরিবারে নেই.. বিয়ের দিনই আমার বিয়ের পোষাক ছিল বোরখা.. আমার মা বাবা ভীষণ খুশী হয়ে গেল.. এমন এক পরিবারে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে দেখে.. জুন মাসের গরমে জীবনে একদিনও বোরখা না পরা আমি হাউ মাউ করে কাঁদলাম.. কেউ শুনলো আমার কথা.. উল্টো ধমক খেতে খেতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হলো.. সেই যে শুরু এখনও চলছে.. ঘামতে ঘামতে আমি এখন এ্যাজমা পেশেন্ট.. চুল পড়তে পড়তে একসময় জঘন্য টাক পড়ে গেল.. আমার স্বামী এমন কুৎসিত স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলো..” নাফিসা আবারও লামিমকে খোঁচা দিয়ে বলে “আপনাকে কী কেউ নিজের যত্ন না নেবার দিব্যি দিয়েছিল” বসে যাওয়া চোখ জোড়ায় আগুনের ফুলকির মতো জ¦লে ওঠে লামিমের “মনের যত্ন যেখানে নেই সেখানে শরীরের যত্ন নিয়ে কী করবো আপা..!”
প্রতিটা মেয়ের মুখ মুহূর্তেই যেন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। নাফিসাও চুপ হয়ে যায়। তবুও যেন নিজের যুক্তি থেকে সরতে চায় না নাফিসা “এতই যদি কড়াকড়ি তাহলে কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন কেন..??” নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে লামিম “একা থাকি.. একদম একা.. আমাকে আলাদা বাসা দেয়া হয়েছে.. তালাক দিলে, আত্মীয় স্বজন ছেলেকে ছিঃ ছিঃ করবে তাই আমি এখন এক ঘরে বউ.. কিন্তু নিয়ম নীতির একচুলও এদিক ওদিক করা সম্ভব নয়.. কারণ.. বোরখা ছাড়া বারান্দায় গেলে যদি কোন পুরুষ আমার মুখ দেখে তাতে গুনাহ হবে স্বামীর..” অদ্ভুত এক হাসির শব্দ শোন যায় লামিমের বোরখার আড়াল থেকে, যেই হাসি তার না বলা অনেক কথার অর্থ একবারেই অনেকখানি বলে দেয় “এখন অন্য কিছু না সদিচ্ছায় ঢেকে রাখি নিজেকে.. যেন আমার মুখ দেখে মনকে বোঝা না যায়.. চিন্তাকে আড়াল করে রাখা যায়.. কষ্টকে লুকিয়ে রাখা যায়.. এই কর্মশালা শুধু নয় মাঝে মধ্যেই স্বামী আসবে না এমন সময়ে বিভিন্ন কর্মশালায় অনলাইনে যোগ দিই.. যদি কোনদিন.. কারো কথায় আমার হারিয়ে যাওয়া আমিকে ফিরে পাই..! নিজের আস্থার উপর নির্ভর করে যদি কিছু করার সাহস হয়..! নিজের জন্য এটুকু চেষ্টাও কী দোষ নাফিসা আপা..?”
নাফিসা লামিমের প্রশ্নের কোন উত্তর দেয় উপরন্তু আরও কয়েক ডিগ্রী বিরক্ত প্রকাশ করে বলে “আই এ্যাম সরি.. আমি আর থাকতে পারছি না.. লিভ করছি মিটিং.. আর রাইসা আপা সময় মতো অফিস সাহেবকে আপনার নামে এ্যাপ্লিকেশান পাঠিয়ে দিব.. জেনে নিবেন..” রাইসা কোন প্রকার বিরক্ত না হয়েই নাফিসাকে বলে “নাফিসা আপা ভার্চুয়াল কর্মশালায় লিভ নেয়া খুব সহজ.. কিন্তু পারলে আমীনা আপার মতো আপাদমস্তক ঢেকে স্কুটি চালানো সম্ভব নয়..” নাফিসা হার মানার পাত্রী নয় “আমি আপনার সাথে তর্ক করতে চাই না..” রাইসাও তার দায়িত্ব থেকে সহজে সরতে চাই না “আত্মনির্ভরশীল হতে চাইলে কিন্তু অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হতে পারে.. তখন যদি এমন ধৈর্য্যধারা হয়ে পড়েন.. সবাই হাসবে.. কেউ কেউ আপনার সামনেই হাসবে.. সহ্য করতে পারবেন তখন..” “চড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব না..” “শশুর..? শাশুড়ী..? বা ননদ..? অথবা পরিবারের অন্য কোন সিনিয়র.. চড় দিবেন তাদেরকে..?”
নাফিসা কোন উত্তর দিতে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা মাইক্রোফোন অন করে বলে। “বসেন আপা..” “থাকেন কিছুক্ষণ..” “ও নাফিসা আপা রাগ হইয়েন না..” “বসেন..” পাপড়ি অনুরোধের স্বরে বলে “আপার কথা শেষ পর্যন্ত শুনেন.. নিশ্চয়ই আপনাদের কষ্ট দেবার মতো কোন কথা তিনি বলবেন না.. বরং যা বলবেন আপনাদের ভালোর জন্য.. এটাই তো আপার কাজ..” অনেকেই পাপড়ির কথায় সায় দেয়। মিষ্টি হাসি দিয়ে রাইসা বলে “আমি কী শুরু করবো..?”
একে একে প্রশিক্ষণার্থীরা এমনভাবে উত্তর দিতে থাকে যেন রাইসা তাদের মন কথা বলবে আরও “জী আপা..” “অবশ্যই আপা..” “শিওর আপা..” সবাই সম্মতি দেয়। শুরু করে রাইসা “থাক আর কারো কথা বলবো না..  আপনাদের কথা বলি শুধু.. আজকের পর থেকে আয়নার সামনে দাঁড়াবেন.. নিজেকে আপাদমস্তক ভালো করে দেখবেন.. শরীরে পোষাক ছাড়া অন্য কোন আবরণ রাখবেন না.. প্রয়োজনে দরজা বন্ধ করে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করবেন ‘আসলে আপনি কী চান?’ আয়নার আপনির চোখে চোখ রেখে প্রশ্নটা করবেন.. যদি উত্তর দিতে কষ্ট হয়.. সময় নেন.. একদিন.. দু’দিন.. তিনদিন.. চারদিন.. সময় নিন.. তারপরও দয়া করে, উত্তরটা দিবেন.. তাড়াহুড়ো নেই.. মাথা ঠান্ডা করে.. যদি জানতে পারেন উত্তরটা.. দেখবেন আপনার চেহারা বদলে গেছে.. তখন যায় পরেন না কেন.. আপনাকে দেখতে সুন্দর লাগবে.. কারণ, গ্ল্যামার থাকে বুদ্ধিমত্তায়.. যিনি যত বেশী ফোকাসড্ হতে পারবেন নিজের কথায়.. কাজে.. তিনি তত বেশি সুন্দর.. তার ভবিষ্যতের পথ ততটাই মসৃণ হয়ে যাবে.. সুতরাং সুন্দর হউন আপন বুদ্ধিতে.. ধার করা বা চাপিয়ে দেয়া কোনকিছু নিয়ে নয়.. যেটা বিশ্বাস করবেন সেটা করতে এবং বলতে পারাকেই বলা হয় আত্মনির্ভরশীলতা..” হঠাৎ করে রাইসার কাঁধে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে একজন মধ্য বয়স্ক নারী অন্যদের উদ্দেশ্যে বলে “কী গো তোমরা এত এনার্জি কোত্থেকে পাও..! একটু ব্রেক দরকার হয় না..? চা পানি কিছু একটা মুখে দাও.. পরিবারের ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে এসো.. প্রয়োজনে রান্নাঘরেও উঁকি দাও.. ”
সবাই হাসে। ভদ্রমহিলা হাসতে হাসতে বলে “সরি.. অফিসিয়াল মিটিং তবুও আমি ঢুকে গেলাম তোমাদের মাঝখানে.. সরি.. ও বউমা একটু ব্রেক নাও মা.. শোন মেয়েরা.. রাইসা বেশি সময় নিবে না.. শুধু এক গ্লাস জুস আর একটা টুকরো বিস্কুট খাবে তারপরই চলে আসবে.. ওহ সরি বলতে ভুলে গেছি.. আমি রাইসার শাশুড়ি..” শাশুড়ির হাসি মুখটা দেখে নিয়ে রাইসা ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বলে “সরি আম্মাকে ভুল বুঝবেন না.. উনি একটু বেশীই টেক কেয়ার করে আমার.. আর এই যে এতক্ষণ যা কিছু বললাম সব কিন্তু আম্মা আমাকে শিখিয়েছেন.. অনার্স পড়তে পড়তে বিয়ে হয়েছিল.. মাষ্টার্স করিয়েছেন.. এখন আদর দিয়ে বাদর বানিয়ে আবার জবও করাচ্ছেন..” হাসতে হাসতে আবার বলে রাইসা “আপনারা চাইলে অনলাইনে থাকতে পারেন.. আবার লিভ নিয়ে পনের মিনিট পর জয়েন করতে পারেন.. পাপড়ি হেল্প করবে.. আমি আসছি..” কথাটা বলেই রাইসা উঠতে যায়, নাফিসা হুট করে বলে “আপা এক মিনিট.. আপনার কথাগুলো কিন্তু আমি বুঝেছি.. তারপরও জোর করে নিজেকে বোঝাতে চাইছিলাম, এই যে বছরের পর বছর আমাদের উপর যা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, এটাই ঠিক.. কারণ.. ভুলকে ভুল বলার সাহস আমাদের নেই.. কিন্তু সত্য কথাটা হলো, আপনিই ঠিক.. অনেস্টলি বলছি আপা.. আই এ্যাম সরি..”
নাফিসার কণ্ঠে আগের সেই ঝাঁজ আর নেই বাকি নারীদের মতোই সেও একজন নারী যেন এখন তার কথায় আলাদা কোন নারী মনে হয় না। রাইসা ভালবাসাময় কণ্ঠে নাফিসাকে বলে “ইটস্ ওকে নাফিসা.. একটা কথা মনে রাখবেন.. দেশের জন্য নারীরা প্রয়োজনে শাড়ী পরেই অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে.. সেখানে আমাদেরকেও নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ধ করতে হবে.. কী পরবো আর কীভাবে জীবন কাটাবো এটা আমাদেরকেই নির্ধারণ করতে হবে.. অন্যের কথায় নয়.. আবারও বলছি, সৌন্দর্য থাকে বুদ্ধিমত্তায়.. আমার কাজই আপনাদের জন্য কল্যাণকর কথা বলা.. কষ্ট দেয়া নয়.. আসছি.. ফিরে এসে আবার কথা হবে..”
উঠে দাঁড়ায় রাইসা। তখন সবাই দেখবে রাইসা অন্তসত্ত্বা। শাশুড়ির হাত শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। এই দেখে কেউ কেউ যেমন হতবাক হয় তেমন কারো কারো চোখ আত্মবিশ্বাসে ঝিলিক দেয়। কারো ঠোঁটে আত্মপ্রত্যয়ের হাসি ফুঁটে ওঠে।

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199