ঘরহীন ঘরে হেলাল হাফিজ

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 14 Dec 2024

3395 বার পড়া হয়েছে

Shoes

অনেক বছর আগে কবি হেলাল হাফিজের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য। বিষয় ছিলো ‘ঢাকার ক্লাব কালচার’। তখন হেলাল ভাইয়ের সকাল থেকে রাত কাটতো জাতীয় প্রেসক্লাবে। চিরকুমার ছিলেন। আশির দশকে বসবাস করতেন পুরানা পল্টনের রবিন প্রিন্টার্স অফিসের মগডালে । Helal Hafizছয় বা সাত তলা বাড়িটার ছাদের ওপর একটা ঘর নিয়ে। চিলোকোঠা যাকে বলা হয়ে থাকে।  তিনবেলাই তার আহারের জায়গা নির্ধারিত ছিলো ক্লাবের ক্যান্টিন। বাকিটা সময় ক্লাবের কার্ড রুম, লাইব্রেরী আর নিছক আড্ডায় সময় পার হয়ে যেতো। রাত নামতো এই শহরে। হেলাল ভাইকে দেখতাম, কাঁধে চিরপরিচিত ঝোলা ব্যাগ নিয়ে নিমগ্ন ভঙ্গীতে পুরানা পল্টনের ডেরার দিকে হেঁটে চলে যেতে।

তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, এতটা সময় আপনি ক্লাবে কাটান কেনো? মাথা নিচু করে সেদিন উত্তরটা মনের মধ্যে গুছিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, আমার আর কোথাও যাবার নেই। ঘুমাবার একটা জায়গা আছে শুধু। তাই অনেকে ক্লাবকে বলে সেকেন্ড হোম, আমি বলি আমার প্রথম গৃহ।

কবি হেলাল হাফিজের সেই ঘরহীন ঘরে বহুবার গিয়েছি নিছক আড্ডার জন্য। প্রচলিত ঘরের সংজ্ঞায় পড়তো না সেই চার দেয়ালের বন্ধন। একটা পরিপাটি করে গোছানো বিছানা, ছোট বুকর‌্যাক আর সংক্ষিপ্ত মাপের একটা টেবিলেই ফুরিয়ে গিয়েছিলো কবির দাঁড়াবার জায়গা।  বাকিটা ছিলো এক উন্মূল, উদ্বাস্তু কবির নিরাসক্তি দিয়ে মোড়ানো পৃথিবী।

নেত্রকোনা জেলা তার জন্মস্থান। ঢাকায় চলে আসার পর জীবনে সম্ভবত বার তিনেক গেছেন সেখানে। এই শহরেরে বেইলি রোডে ভাইয়ের সরকারী কোয়াটার, পল্টনের চিলেকোঠা হয়ে তোপখানা রোডে একটা হোটেলে স্থায়ী বোর্ডার হিসাবে থিতু হয়েছিলেন বেশ অনেকদিন। হেলাল হাফিজের নিজের ঘর বলে কিছু ছিলো না প্রকৃতপক্ষে। তার সামাজিক বসবার ঘর বলতে ওই প্রেসক্লাব। পল্টনের সেই ঘরটা যখন ছেড়ে দেন তখন একদিন বলেছিলেন, আমার জন্য একটা বাসা খোঁজ কোরো তো। অবাক হয়েছিলাম শুনে। কবি হেলাল হাফিজ কি সংসারী হতে চাইছেন? কয়েকদিন দু‘জন পায়ে হেঁটে সেগুনবাগিচা এলাকায় বাসার খোঁজও করেছি। তখন নানান গল্প হতো হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে। খুব অল্প কথা বলতেন। নীরবে হাঁটতেই পছন্দ করতেন। আমি প্রশ্ন করে করে অনেক কথা জানতে চাইতাম। সেই ঘর খোঁজার দিনগুলোতেই হেলাল ভাই হঠাৎ জানালেন তিনি কিছুদিনের জন্য সেগুনবাগিচা এলাকার বিখ্যাত চিটাগাং হোটেলে উঠবেন। কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে চলে আসেন তোপখানা রোডে সম্ভবত হোটেল এশিয়ায়। ওরা তাকে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে একটা রুম বরাদ্দ দেয়।

হেলাল ভাই সবসময় প্রেসক্লাবের আশপাশে থাকতে চাইতেন। তার হোটেলে বসবাসের দিনগুলিতে দেখেছি ক্লাবের পিওন তার জন্য তিনবেলা খাবার নিয়ে যেতো। পল্টনের বাসা অথবা হোটেলে থাকার সময়ে হেলাল ভাই জামাকাপড় ধোয়ার জন্য অদ্ভুত একটা কাজ করতেন। তোপখানা রোডে একদা পিনম্যান ডি প্যারিস নামে একটি বড় লন্ড্রি ছিলো। তিনি সেকালে ক্লাবে যাওয়ার সময় আগের দিনের কাপড় পরে বের হতেন। তারপর সোজা গিয়ে ঢুকে পড়তেন সেই লন্ড্রিতে। সেখানেই ময়লা পোশাক জমা দিয়ে আগে দিয়ে রাখা একসেট ধোয়া জামা প্যান্ট পাল্টে পরে ‍নিতেন।

কোথাও কোনো শিকড় ছিলো না মানুষটার। হয়তো কোনো একদিন ছড়াতে চেয়েও পারেননি। তাই উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিলেন। তার জীবনের শেষ দিনটাও কেটেছে শাহবাগে সাকুরা রেস্তোরাঁর গলিতে একটা হোটেলে। হোটেলের ঘরে ওয়াশরুমে নিথর পড়েছিলো তার শরীর জীবনের সব উদ্বাস্তু গল্প শেষে। কবি হেলাল হাফিজের একলা জীবনের গল্প এভাবেই শেষ হলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই উন্মাদ শহরে এখন শীত নামছে। ভিড়, চিৎকার আর নানান প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে অনেক দূরে একটি নিঃসঙ্গ জীবন নিভে গেলো। মানুষ কী খোঁজে? কবিরাই বা কী খুঁজে বেড়ায় জীবনের আবর্তনের ভিতরে। হেলাল ভাই কি এখনও সেগুনবাগিচায় বাড়ি খুঁজছেন? কবরের অতল অন্ধকারে তিনি আরেকটা নতুন ঘর পেয়েছেন কি না জানি না আমি।

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199