১২ই সেপ্টেম্বর…

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 14 Sept 2023

4500 বার পড়া হয়েছে

Shoes
জয়দীপ রায়

সকালে উঠে দেখি আজ ১২ই সেপ্টেম্বর। বিভূতিভূষণের জন্মদিন। শকুন্তলাকে বললাম, জন্মদিনে কখনও শ্রীপল্লী যাইনি, চল যাই। তোকে নতুন একটা জায়গাও দেখাবো। আরামডাঙা। আমিও দেখিনি কখনও। একটা রাস্তা আছে শানুদের বাড়ির পাশ দিয়ে। ওইদিকেই বোধহয় মরগাং। ইছামতির মরগাংয়ের কথা পাওয়া যায় ওঁনার লেখায়।

বেরোতে বেরোতে দুপুর হয়ে গেলো। শকুন্তলা দেখি ছাদের থেকে দুটো খয়েরী রংয়ের পদ্মের সাইজের কি যেন নাম ফুল, আর এক থোকা রঙ্গন নিয়ে নামলো। খুব আনন্দ হলো। পথের কবির পায়ে আমাদের বাড়ির ফুলও থাকবে।

টালিখোলার রাস্তা দিয়ে গেলাম। এই রাস্তাটাই তো আসল রাস্তা। ইছামতির কোল ঘেঁসে। নতুন বাসচলা রাস্তা তো সেদিন হলো! বাঁশবাগানের নীচে দিয়ে যেতে যেতে দেখি শ্যাওলা আর কচুরিপানায় ছটফট করছে নদী। সামনে তিনরাস্তার মোড়। পথের মধ্যে বাঁধানো অশ্বথ্থগাছটা এই সেদিন ঝড়ে গোড়া থেকে উপড়ে গেছে। ডানদিকে গেলে বিভূতিঘাট। আমরা বাঁদিক দিয়ে একটু গিয়েই ওঁনার বাড়ির রাস্তায় ঢুকে পড়লাম।

বাড়িতে আজ তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর থেকে অনুষ্ঠান হচ্ছে। বারান্দার গেট আজ খোলা। আমি আর শকুন্তলা মন্দিরের মতো বাড়িতে উঠলাম। বারান্দায় ঈশ্বরের মুর্তি। পায়ে ফুল দিলাম। প্রণাম করলাম। শতাব্দীপ্রাচীন বৃক্ষে বাড়ি ছায়াময়। এই গ্রীষ্মেও যেন সবকিছু শীতল হয়ে রয়েছে। আমরা ঘরে ঢুকলাম। মেঝেতে সুন্দর আলপনা। দেওয়াল জুড়ে নানান ছবি। তার মধ্যে দেখি আমাদের একটা ক্যালেন্ডার। নতুন ক্যালেন্ডার হলে জানুয়ারিতে একদিন সন্ধ্যেবেলা এসে গ্রীলের ফাঁক দিয়ে বিভূতিভূষণকে দিয়ে এসেছিলাম। সেটাই কেউ দেওয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছে। এই ঘরে কখনও আসিনি আগে। এই পথে একা একা হাঁটতেন বিভূতিভূষণ।

বিভূতিঘাটে এসে দেখি অনেক লোকজন, প্যান্ডেল। আমরা সোজা চলে গেলাম শ্রীপল্লী বাজার থেকে ডানদিকে শানুদের বাড়ির পাশ দিয়ে আরামডাঙার রাস্তায়। ছোট ঢালাই রাস্তা। কোথায় যাব জানি না। একজন গ্রামের মহিলা আসছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, মরগাং জানেন কিনা। বললেন, হ্যাঁ, ওই দিকটায় সাঁকো পেরিয়ে খানিকটা গিয়ে মরগাং। সামনে কাঁচিকাটা ঘাট। কেদারঘাটও বলে। তার আগেই বাঁদিকে রাস্তা কেটে গেছে। আমার তো এখানেই বাপের বাড়ি, এখানেই শ্বশুরবাড়ি। আমি সব চিনি। আমাদের বাড়ি চলেন। দু’টো ভাত খাবেন।

আর একদিন আসবো বলে আমরা এগিয়ে গেলাম। খানিকটা গিয়ে রাস্তা শেষ। বাঁশবাগান। ফাঁক দিয়ে নদী দেখা যাচ্ছে। আমরা সুঁড়িপথ ধরে নদীর ধারে নামলাম। বাঁদিকে একটা বড় ঝিঁঙেক্ষেত। নদী এখানে বাঁক নিয়ে চলে গেছে। ওপারে মাধবপুর। নদী এদিকে ভেঙেছে। ওপারে চর পড়েছে। সেখানে একটু দূরে রিভারপাম্পের পিছনে ভর্তি কাশবন। বাঁদিক দিয়ে একটা খাল এসে নদীতে পড়েছে।

আমাদের যখন মনে নদীসংক্রান্ত অনেক প্রশ্ন, তখনই ঝিঁঙেক্ষেতের মালিক আসলেন। যে দুটো মোটা মোটা ঝিঙেকে আমরা সবচেয়ে সুস্বাদু বলে ভাবছিলাম, সে দুটোর পেটভর্তি বীজ জানালেন এবং বললেন এক সোমথ্থ নদীর কথা। স্রোতস্বীনি, কাঁচজল ইছামতির কথা। মরগাং তো মরা গাং। বহু আগে ইছামতি ওখান দিয়ে বইতো। তারপরে বাঁওড় তৈরী করে এদিকে চলে এসেছে। এখন ধানচাষ হয়। তা আমাদের বাড়ি দুটো খেয়ে যান। দুপুরবেলা।

রবিউল চাচা

আমি আর শকুন্তলা শুধু একজন আর একজনের দিকে তাকাই। আজ বিভূতিভূষণকে খুঁজতে আমরা বনঘেরা ইছামতিতীর ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। কত পাতাবাহারের বেড়া, কত ধূপধুনো, কত সুগন্ধ আজ শ্রীপল্লী বারাকপুরের পথেঘাটে। আমরা যাঁকেই বিভূতিভূষণের কথা বলি, তিনিই আমাদের দুপুরে বাড়িতে খেয়ে যেতে বলেন, যাঁর কাছে জানতে চাই মরগাংয়ের পথ, তিনিও দুপুরে খাওয়ার কথা বলেন। কেউ জিজ্ঞেস করেনা, বাড়ি কোথায়? কি কাজ এদিকে? দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস।

আমরা মরগাং খুঁজতে একটা কাঠের পাটাতনের লোহার সাঁকো পার হই। একটা খাল ইছামতিতে গিয়ে পড়েছে। দাড়িকাটা ব্রীজ হয়ে শ্রীপল্লীর বাঁওড় এখানে এসে মিশেছে। খাল পেরোতেই সাদা দাড়ির এক খালি গা ফেরেশতা মানুষ। বললেন, কি সাংঘাতিক স্রোত ছিল এই খালের! পুরো নহাটা গোপালনগর আকাইপুরের সব জল এখান দিয়ে ভাঙতো নদীতে। তখন নদীও ছিল তেমন। সোজাসুজি নৌকা পার হতে পারতো না। তা মরগাং তো এখান থেকে অনেক দূর! এক কিলোমিটার। এই রোদ্দুরে এতটা হেঁটে যাবেন! বাড়িতে দিশি মুরগি রান্না হয়েছে। দুটো খেয়ে যান।

আমি আর শকুন্তলা একজন আর এক জনের দিকে তাকাতে পারছিনা, আমরা কত কাছের মানুষকেও বাড়ি ডাকতে ভুলে যাই। অথচ দু’জন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ, শহুরে সেয়ানা মানুষকে কিভাবে মুহুর্তে আপন করে নিতে পারে গ্রাম্যবধু, ক্ষেতমালিক বা রবিউল চাচার মত মানুষেরা!

হঠাৎ বৃষ্টি নামলো। নদীর পরে বৃষ্টি। আমরা দৌড়ে কাঠের সেতু পার হয়ে যাই। আমাদের হাতে রবিউল চাচির রান্নার ঘ্রাণ। আমরা বৃষ্টির জলে নিজেদের ধুয়ে ফেলতে ফেলতে এগোই। বাঁদিকে কচার বেড়া। কয়েকটা ডাল ভেঙে নিই বাড়িতে পুঁতবো বলে। আসে ভাঁটুফুলের জঙ্গল। আমরা সেসব পেরিয়ে ঘরের দিকে যাই। বাড়ির দিকে।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199