গাড়োয়ালের এক গ্রাম

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 7 Mar 2019

1970 বার পড়া হয়েছে

Shoes
এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক।বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

দূরে কোনো কারখানার ঘণ্টি বাজার সোরগোলে আমার ঘুম ভেঙে গেলো, অন্তত প্রথমে আমার তাই মনে হয়েছে। কিন্তু না, আসলে জানালার অদূরে একটা লেবু গাছে অবস্থান নেয়া একটি মাত্র ঝিঁঝির গগনবিদারি চিৎকার ওটা।
খোলা জানালাপথে চকচকা পাতার লেবু গাছটির দিকে নজর গেলো; গাছের ভেতর দিয়ে দৃষ্টি চলে গেলো পাহাড়ের দিকে, হিমালয়Ñ আকাশঅব্দি বিস্তৃত হিমালয়ের দিকে।
‘হাজার বছরেও প্রভু হিমাচলের স্তুতিবর্ণনা সম্ভব হয়নি।’ কোনো এক সংস্কৃত কবি একথা স্বীকার করেছেন ভারতীয় ইতিহাসের ঊষালগ্নে। সমুদ্র মনোযোগ কাড়তে সমর্থ হয়েছে স্টিভেনসন, কনরাড, মেলভিল ও হেমিংওয়ের মতো লেখকদের; পাহাড়, গিরিশ্রেণির ক্ষেত্রে তা হয়নি। সুউচ্চ শৃঙ্গসমুহ জয় করেছি আমরা একে একে, পদচিহ্ন এঁকেছি দুর্গম গিরিপথে, কিন্তু তা সত্ত্বেও যেন এরা এদের গোপনীয়তা বজায় রেখে চলেছে, রহস্যাবরণে আড়াল করে রাখছে যক্ষের ধনের মতো এদের অনেক ঐশ্বর্যকে।
আশ্চর্যের কিছু নেই যে কুয়াশাবৃত উপত্যকার ঢালে বসবাসকারী মানুষগুলো বহু আগে থেকেই বিনয় ও ধৈর্য শিখেছে। নিচে জমাট বেঁধে থাকা কুয়াশার আড়ালে তাদের গাঁ। ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এলে রডোডেনড্রন, পাইন, দেবদারুর বন। গিরি সুরঙ্গ থেকে বয়ে আসা হিমশিতল বাতাস ফিসফিসিয়ে খেলা করে যায় এই বনের ভেতর দিয়ে। গাঁয়ের মেয়েরা চাষবাস করে, পুরুষেরা সমতলে যায় কাজের খোঁজে। সুন্দর এই পাহাড়ে ফসল ফলে সামান্যই।

গাড়োয়ালের মঞ্জরি গ্রামের কথা ভাবলে আমার চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে ওঠে তা হলো, একটা গভীর গিরিখাদ ধরে প্রস্তরাকীর্ণ পথ বেয়ে বেগেপ্রবাহিত হয়ে যাওয়া একটা ছোটো নদী, গঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসা এক উপনদী। নদীর দুই পারে ও উপরে সমতল জায়গাগুলোতে ফসলের চাষ হয়, ভুট্টা, বার্লি বা যব, সর্ষে, গোলআলু, পেঁয়াজ, ইত্যাদি। গ্রামগুলোর কাছাকাছি কিছু ফলের গাছও দেখা যায়- এগুলো প্রধানত পিচ বা অ্যাপ্রিকট (খুবানি)। কোনো কোনো পাহাড়ের ধার এবড়োখেবড়ো ও নাঙ্গা; ওই অংশগুলো কোয়ার্টজ বা গ্র্যানাইট পাথরের। শূন্যে মুখ বিকশিত করে থাকা পাহাড়গাত্রে কিছু ঘাস-লতাগুল্ম ছাড়া আর কিছু জন্মায়না।
এই ভূ-চিত্র, ভারতের সর্বোত্তরে অবস্থিত অঞ্চলগুলোর একটি-গাড়োয়ালের, প্রতকিী। এর বিশাল বিশাল বরফাচ্ছন্ন শৃঙ্গগুলো তিব্বতের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। জনসংখ্যা কম হলেও গাড়োয়াল স্থানীয়দের জন্য উত্তম জীবিকা প্রদানে অক্ষম।
‘অপরূপ তোমাদের প্রাকৃতিক দৃশ্য এখানে,’ একটা পাহাড় অতিক্রম করে আসার পর বললাম।
‘তা ঠিক,’ বলল বন্ধু, ‘তবে দৃশ্য দেখে পেট চলেনা, এই যা।’
সে যাই বলুক, এ অঞ্চলের মানুষগুলো বেশ কষ্টসহিষ্ণু, ধৈর্যশীল ও হাসি-খুশি। এখানকার অনুর্বর পাথুরে মাটি ভেঙে কোনোমতে একটা জীবিকা বের করে আনে তারা।
এদের এখানে অতিথি হয়েছি কিছুদিনের জন্য। বন্ধু গজাধর আমাকে নয়ার নদীর উপরে গাঁয়ে এনে তুলেছে তার বাড়িতে। আমার নিজের বাড়ি মুসৌরি হিল-স্টেশনের কাছে, পশ্চিমদিক পানে দুইদিনের পথ। ট্রেনে চেপে এসেছি আমরা গঙ্গা পার হয়ে পাহাড়ের তলা পর্যন্ত, তারপর বাস চেপে আসা গাড়ি বদল করে করে। পাহাড়ের শরীর কেটে বানানো চুলের কাঁটার মতো বাঁক সহ মেলা প্যাঁচালো রাস্তা ঘুরে মাথায় ঝিমঝিমানি ভাব নিয়ে এসে নেমেছি ছোট্ট হিল-টাউন ল্যান্সডাউনি-তে। শহরটি গাড়োয়াল রাইফেলস-এর প্রধান নিয়োগকেন্দ্র। গাড়োয়াল সৈনিকরা উভয় মহাযুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এরা এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভূমিকা রাখছে। এইসব সেনাসদস্যর পাঠানো টাকা গ্রামের অর্থনীতির বুনিয়াদ।
ল্যান্সডাউনি ৬০০০ ফুটের একটু বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। ওখান থেকে গোটাদিন ধরে মাইল পঁচিশেক হেঁটে পৌঁছলাম মঞ্জরি গ্রামে। দুধাতলি পাহাড়শ্রেনীর ঢালের সমতলগুলো জুড়ে গ্রামটি।
এই গ্রামে আজ আমার চতুর্থ দিন। এর আগের ক’দিন ভোরের ঘুম ভেঙেছে আমার ওক্ আর মেডলার গাছের উপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো লালঠুটো নীল ম্যাগপাইয়ের ডাকে। তবে আজ ঝিঁঝির ডাক পাখির কলরবকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করেছে। এসময়টা ঠিক ঝিঁঝির নয়, তবে সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি হঠাৎ একটু গরম পড়ায় ওরা হয়তো ভেবেছে সঙ্গীকে আহ্বানের সময় হয়েছে আবার।
বরাবরের মতো আমিই সবার শেষে উঠলাম। গজাধর তখন উঠানে শরীরচর্চা করছে, সে যোগব্যায়াম আর সুইডিস কিছু ব্যায়ামের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তার শারীরিক সামর্থ আর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অফিসার-ক্যাডেট হিসেবে তার নিয়োগের স্বপ্ন পূরণে সমর্থ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যসব গাড়োয়ালিদের মতো সেও পরিবারের সেনা ঐতিহ্যের গর্ব বুকে নিয়ে বেড়ায়। কোনো গাড়োয়ালিই ভুলতে পারেনা যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথম ভারতীয় হিসেবে যিনি ভিক্টোরিয়া ক্রস জিতেছিলেন তিনি আর কেউনা, একজন গাড়োয়ালি রাইফেলম্যান গাব্বার সিং নেগি। ফ্ল্যান্ডারসের কর্দমাক্ত রণাঙ্গনে নিহত হয়েছিলেন তিনি।
গজাধরের ছোটো ভাই চক্রধর বাড়িতে থেকে মহিষের দুধ দোয়াচ্ছে। সে দেখতে কৃশকায়, গায়ের রং ফর্সা, গালের হাড়দুটো উঁচু। অন্যদিন এই সময়ে তার পাঁচ মাইল দূরে অবস্থিতস্কুলের পথে হাঁটতে থাকার কথা, কিন্তু আজ বন্ধের দিন হওয়ায় সে বাড়ির কাজে সাহায্য করতে পারছে।
এদের মা আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত। ভদ্রমহিলা তার ভারী রূপারদুলের ভারে ঝুলে যাওয়া কান নিয়েও দেখতে বেশ সুশ্রী। গাড়োয়ালের মেয়েরা তাদের সঞ্চয় মূলত সোনা-রূপার অলঙ্কার গড়াতে ব্যয় করে থাকে- নাকের নথ, কানের দুল, চুড়ি, বালা, আবার কখনোবা পুরনো রূপার মুদ্রায় গড়া গলার হার এই সব। বিয়ের সময় সাধারণত বরের বাবা-মা সুন্দরী কনের বাবা-মা’কে একটুকরো জমি প্রদান করে। এটা যেন প্রচলিত যৌতুক প্রথার উল্টো।
এদের বাবা সেনাবাহিনীতে একজন করপোরাল এবং তিনি বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকেন। গজাধর বিয়ে করলে সম্ভবত তার স্ত্রীও গাঁয়ে থেকে যাবে শাশুড়িকে ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য- ক্ষেতের কাজ, ছাগল, মহিষ, এসব দেখাশুনা কম কাজ নয়। ছুটিতে বাড়ি এলেই কেবল গজাধর তার বৌয়ের দেখা পাবে।
গ্রামটি নদী থেকে অনেক উঁচুতে, কাজেই ফসলের জন্য বৃষ্টির উপর বেশ নির্ভর করতে হয়। কিন্তু রান্না, ধোয়াপাকলা ও পান করার পানিতো বয়ে আনতেই হয়। গাজরের কিমা পোরা মোটাসোটা চাপাতি আর গরম দুধে নাস্তা সেরে ছোটো ভাইটি আর আমি নদীর পথ ধরলাম।
পাহাড়ের উপরে সূর্য উঠে গেছে, কিন্তু এই অপ্রশস্ত উপত্যকায় তা এখনো প্রকাশিত হয়নি। নদীতে গোসল করতে নেমে যাই। চক্রধর প্রকার এক পাথরের উপর থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে, ওদিকে নদীর গভীরতা ও স্রোত সম্পর্কে ধারণা না থাকায় আমি পাড়ের কাছে সাঁতার কাটি। বরফ গলে আসা নীলাভদুগ্ধরঙা পানি প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমি অল্পতে গোসল সেরে দৌড়ে চলে যাই বালি বিছানো তীরে, যেখানে উত্তাপ নিয়ে একফালি সূর্যালোক এসে পড়েছে। ঠিক সেই সময় বৃক্ষছায়া থেকে আঁধারের রহস্য বয়ে নিয়ে ভেসে আসে ঘুঘুর ডাক।
মঞ্জরির স্কুলটিতে পঞ্চমশ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়, আর সর্বমোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা চল্লিশজন মতো। এসব ছাত্র-ছাত্রী (বেশিরভাগ ছাত্র) যদি চক্রধরের মতো পড়াশুনা চালিয়ে যেতে চায় তো তাদেরকেও প্রতিদিন পাঁচ মাইল করে পায়ে হেঁটে পরবর্তী বড় গ্রামে গিয়ে হাইস্কুলে পড়তে হবে।
‘প্রতিদিন দশ মাইল করে হাঁটা ভীষণ ক্লান্তিকর নয়?’ জিজ্ঞেস করলাম তাকে।
‘অভ্যাস হয়ে গেছে,’ বললো চক্রধর। ‘তাছাড়া হাঁটতে ভালই লাগে আমার।’
আমি জানি দিনে দু’বার খায় সে, সকাল সাতটায় স্কুলে যাবার সময়, আর সন্ধ্যে ছ’টা কি সাতটায় স্কুল থেকে ফিরে। জানতে চাইলাম পথে খিদে পায় কিনা তার।
‘বুনো ফলতো কিছুনা কিছু পেয়েই যাই।’ বলল সে।
বুনোফলের বিশারদ সে: বেগুনি জাম, ঘনসবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে পেকে থাকা লাল জঙলা স্ট্রবেরি, টক্ চেরিফল, বুনো নাসপাতি, রাজবেরি, সব তার জানা। চক্রধরের মজবুত দাঁত আর অনুসন্ধানী জিভ ওসব ফলের টক বা মিষ্টি স্বাদ ঠিকই চেখে নিতে পারে। বসন্তকালে রডোডেনড্রন ফোটে। তার মা ও দিয়ে জ্যাম তৈরি করেন, তবে চক্রধর ওগুলো কাঁচা খেতে পছন্দ করে। পাঁপড়ি ছিঁড়ে নিয়ে মুখে ফেলে পিষে মিষ্টিরস নিংড়ে গেলে সে। চক্রধর অসুস্থ হয়না।
‘এই এলাকার লোকজন অসুস্থ হলে কী করে?’ এই গাঁয়ে কোনো ওষুধের দোকান বা হাসপাতাল নেই জেনে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করি আমি।
‘সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিশ্রাম নিতে হয়।’ উত্তর দিল এবার গজাধর। ‘আমারাও কিছু ওষুধ জানি। তবে কেউ বেশি অসুস্থ হলে তাকে ল্যান্সডাউনির হাসপাতালে বয়ে নিয়ে যেতে হয়।’
সুখের কথা হলো এখানকার বিশুদ্ধ পাহাড়ি বাতাস আর সহজ খাদ্যাভ্যাস এলাকার মানুষদেরকে বেশিরভাগ রোগ থেকে মুক্ত রাখে। বিপদ হয় যখন আচমকা কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়- যেমন কোনো কাস্তে বা কুড়ালের আঘাত লেগে যায় কারো, বা কোনো বন্য প্রাণী কাউকে আক্রমণ করে, যেমন কোনো শূকর।

একদিন রাতে চালের উপর একটা ধুপধাপ শব্দে আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। গজাধরকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করলাম কী ব্যাপার।
‘কিছুনা, ভালুক,’ বললো সে।
‘ঘরের ভেতর ঢুকতে চাচ্ছে?’
‘না, শস্যখেত শেষ করে এখন এসেছে চালার উপরকার কুমড়ো সাবাড় করতে।’
শীতের প্রাক্কালে পাহাড়ের উপরের দিকটা বরফে মুড়ে গেলে হিমালয়ের কালো ও সাদা ভালুকগুলো খাবারের সন্ধানে নিচে নেমে আসে। দুর্বল দৃষ্টিশক্তি আর সন্দেহপ্রবণ স্বভাবের জন্য এরা বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে; তবে অন্য যে কোনো জানোয়ারের মতো এরাও পারতপক্ষে মানুষকে এড়িয়ে চলতে চায়। সঙ্গে বাচ্চা থাকলে এরা তখন অক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। গজাধর পরামর্শ দিলো কখনো ভালুকের তাড়া খেলে আমি যেন ঢাল বেয়ে নিচের দিকে ছুটে যাই, কারণ ভালুকদের জন্য নাকি নামার চেয়ে ওঠা বেশি সুবিধের।
ভালুকের তাড়া খাওয়ার বিন্দু মাত্র আগ্রহ আমার ছিলোনা, কিন্তু পরের রাতে গজাধরের সঙ্গে শস্যখেতে পাহাড়ায় থাকলাম যাতে ভালুক এসে তার ফসল বিনষ্ট করতে না পারে। একটা উঁচু পাথরের স্তুপের উপর উঠে দুজন অবস্থান নিলাম; চাঁদের আলোয় শস্যক্ষেত্রের পুরোটাই দৃষ্টিসীমায় রয়েছে।
মধ্যরাতের দিকে খেতের কিনারা ধরে ভালুক এলো। পিছনের পা’জোড়ার উপর সটান দাঁড়িয়ে সে প্রথমে দেখে নিল কোথাও কেউ আছে কিনা। এরপর জঙ্গল ছেড়ে আস্তে আস্তে ফসলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলো।
হঠাৎ জানোয়ারটি দাঁড়িয়ে গেলো, কিছুদিন আগে এলাকায় ঘুরতে আসা কিছু তিব্বতি বৌদ্ধের টাঙিয়ে যাওয়া বিভিন্ন রঙের তিন-কোণা ভক্তি-পতাকার প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। পতাকাগুলো দেখে সে বিরক্তিসূচক একটা ‘ঘোৎ’ করলো, তারপর জঙ্গলে ফিরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু খুব কৌতূহলী প্রাণীদের একটি হওয়ায় সে কী ভেবে আবার ফিরে এলো পতাকাগুলোর কাছে, তারপর আবার দু’পায়ে দাঁড়ালো প্রথমে একদিকে হেলে,পরে আরেকদিকে।
পতাকাগুলো তাকে আক্রমণ করছেনা দেখে এবার সে নিজেই ওগুলোকে আক্রমণ করে বসলো- একে একে সবগুলোকে উপড়ে ফেলল। ধরাশায়ী শত্রুদের ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়ে পরে সে ক্ষেেতর দিকে এগুতে থাকলো।
এই পর্যায়ে গজাধর চিল্লাতে শুরু করলো। অবশিষ্ট গ্রামবাসী তখন উঠে পড়েছে এবং তারা ঢোল বাজাতে বাজাতে ও কেরোসিনের টিন পেটাতে পেটাতে ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
‘নিশ্চিত খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ভালুক ভীষণ মেজাজ খারাপ করে ঢাল বেয়ে নেমে পালাতে শুরু করলো, ছোটার গতিও বেশ। আমার ভাগ্য ভালো যে ওই সময় আমি ওর সামনে পড়িনি। বুঝলাম, ওঠা কী নামা, কোনো সময়েই এক রুদ্ধ ভালুকের মুখোমুখি হওয়া নিরাপদ নয়।

পরের দিনটা গজাধরের জন্য ধৈর্য পরীক্ষার দিন। সেনাবাহিনীতে তার ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল আসার দিন।
ডাকপিয়ন এখনো এসে পৌঁছায়নি। ডাক আসে পালা করে ল্যান্সডাউনির পিয়নের হাত ঘুরে মঞ্জরির পিয়নের কাছে। মঞ্জরির ডাকপিয়ন সব ডাক গ্রামের ঘরে ঘরে বিলি করে। এতে দুপুর বারোটা হয়ে যায়, কিন্তু এখন তিনটা বাজে।
প্রথমে আমরা শুনলাম পথে ভূমিধ্বস নামায় রাস্তা বন্ধ, কাজেই ডাকপিয়ন আসতে পারবেনা। পরে শুনলাম ভূমিধ্বস সত্ত্বেও ডাকপিয়ন জায়গাটা পার হতে পেরেছে নিরাপদে। আরেকটা ভয়ঙ্কর গুজব এলো যে ডাকপিয়ন ভূমিধ্বসে নিখোঁজ হয়েছে। পরেই অবশ্য এই খবর অস্বীকার করা হলো, পরিবর্তে বলা হলো, ডাকপিয়নের কিছু হয়নি তবে ডাকের ব্যাগ হারিয়ে গেছে।
সে যাই হোক, একসময় এসব গুজবের আর গুরুত্ব থাকলোনা। গজাধর পাশ করেছে এবং পরদিন সকালে সে আমার সঙ্গে রওনা হচ্ছে।
তাদের মা পুত্রের এই সাফল্যে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের খাইয়ে উৎসব করতে চাইলেন। প্রতিবেশীর একজন একটা তিতির ও তিনটা মুরগি পাঠালেন। (প্রতিবেশীর বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে, আর গজাধর একজন সম্ভাবনাময় যোগ্য বর)। যাদের আহার্য তালিকায় ডাল, ভাত, আলু, পেঁয়াজ-এর বাইরে সাধারণত কিছু থাকেনা তাদের জন্য তিতির, মুরগি, ভোজের চাইতেও বেশি।
ভূরিভোজনের পর চললো গান, গজাধরের মা ধরলেন বিরহের গীত যারা দীর্ঘদিন বাড়ি ছেড়ে দূরে থকে এবং বাড়িফেরার জন্য ছট্ফট্ করতে থাকেÑতাদের উদ্দেশে। এটা একটা পুরনো গাড়োয়ালি লোকসঙ্গীত-

ওহ আমার বাপের বাড়ির দূতালি পাহাড়ি হাওয়া-
যাও, আমার বাপেরবাড়ির আঙিনায় গিয়ে বলো,
শুনবে আমার মা।
ভাইকে পাঠাবে আমাকে নিয়ে যেতে।
হাঁড়িতে এক দানা চাল কেঁদে কয়,
‘আহা, যদি বেরুতে পারতাম!’
আমিও ভাবি, কোনোদিন কী যেতে পারবো বাপের বাড়ি?

হাতে হাতে ঘুরতে থাকে হুঁকা, চলতে থাকে গল্প, এ কান ও কান হতে থাকে পরচর্চা। শেষ মেহমানটি বিদায় নেন মাঝরাতের দিকে। আমি ঘুমাবার প্রস্তুতি নিতে গজাধর কাছে আসলো।
‘আবার আসবেন কী আপনি?’ জিজ্ঞেস করলো সে।
‘নিশ্চয়ই আসবো,’ বললাম আমি। ‘পরের বছর না পারলেও তার পরের বছর।’
চাঁদ ওঠেনি এখনো। অন্ধকারে প্রদীপশিখা কাঁপছে, দেখা যায়। চলতে গিয়ে এখানে সবাই একটা লণ্ঠন বহন করে, এমনকি অন্ধ ব্যক্তিও। আপনি যদি এক অন্ধকে জিজ্ঞেস করেন লণ্ঠনে তার প্রয়োজন কী, জবাবে সে বলবে, ‘কোনো বে-আক্কেল যাতে আমার উপর এসে না পড়ে অন্ধকারে।’
পাহাড়ের ধারে নিঃশব্দে জ্বলতে থাকা প্রদীপগুলো একসময় নিবতে থাকলো একে একে। প্রতিদিনের মতো আরেকটি গাড়োয়ালি দিন পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মধ্যে বিদায় নিলো।
আমার কুটিরে আড়মোড়া ভাঙি আমি। ছোট্ট জানালার বাইরে বিশাল আকাশে উজ্জ্বল তারার মেলা। চোখ মুদে আসতে আসতে টের পাই কেউ যেন লেবুগাছটাকে ঘসটে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রাতের বাতাস বয়ে নিয়ে এলো টাটকা লেবুপাতার সুঘ্রাণ। মুহুর্ত্তটা চিরস্মরণীয় হয়ে রইলো আমার স্মৃতিপটে।(চলবে)

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199