সময়ের তাকে একটি পুরনো বই

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 25 Apr 2024

5350 বার পড়া হয়েছে

Shoes

  সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্ব বই দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম অনেকেই বই পড়া নিয়ে, প্রিয় বই নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন। রাজনীতি, সামাজিক বিপন্নতা, খুন, জখম, ধর্ষণ আর দুর্নীতির রমরমা বাজারের মাঝে কেউ কেউ যে আজও বই পড়া নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন জেনে ভালো লাগলো। বাড়িতে বইয়ের আলমারিতে পুরনো বই ঘাটাঘাটি করছিলাম। হঠাৎ একটা পুরনো বইয়ের দিকে দৃষ্টি গেলো। পুরনো বই তো বইয়ের তাকে নতুন বইয়ের ভিড়ে মনমরা হয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। ধূলো মাখা, ম্লান পুরনো বই। তাক থেকে নামিয়ে আনি। মলাট উল্টাতেই দেখি পুরনো দিনের মতো একটা পৃষ্ঠায় বোল্ড টাইপে লেখা উপহার। একদা বইতে এরকম উপহার লেখা ছাপিয়ে নিচে খালি জায়গা রাখা হতো দাতা ও প্রাপকের নাম লেখার জন্য। বইটা আমার দাদা প্রয়াত সৈয়দ শামসুদ্দিন আহমেদ তার স্ত্রী অর্থাৎ আমার দাদু হাসিনা বানুকে দিয়েছিলেন। তারিখের জায়গায় এসে চোখ কপালে উঠলো। ১৯৩০ সালের ৩ মার্চ তিনি স্ত্রীকে বইটা উপহার দিয়েছিলেন। বইটা আমাদের পরিবারেই তার মুদ্রিত জীবনের ৯৪ বছর পার করে দিয়েছে!

পুরনো, মুখচোরা বইটি একটি উপন্যাস। নাম ‘অগ্নিসংস্কার’। লেখক শ্রী নরেশচন্দ্র সেন গুপ্ত। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটির তিনটি সংস্করণ হয়। প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স। উপন্যাসটির মূল্য দেড় টাকা। ভেবে দেখলাম, এই উপন্যাস যখন প্রকাশিত হয় তখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবিত। গীতাঞ্জলি ১৯১০ সালে লেখা হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘বড় দিদি’ প্রকাশ পেয়েছে ১৯১৩ সালে অর্থাৎ ১৭ বছর আগে।

উপন্যাসের শুরুতেই বেশ নাটকীয় ভাবে তিনি কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র সত্যেশের সঙ্গে একটি মেয়ের পরিচয় পর্বে  লিখেছেন, ‘হঠাৎ ঘরের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিল একটি মেয়ে! সত্যেশ দেখিল, একটি অপ্সরা। একরাশ বেল-ফুলের উপর একটা চমৎকার পদ্ম। বয়স ১৪/ ১৫; রঙ ফুটফুটে। মুখখানি ঢলঢলে। চোখ-দুটো বড়, শান্ত, নম্র, উজ্জ্বল’’। অগ্নিসংস্কার একটি সামাজিক উপন্যাস। নারীর উত্থান এবং স্বাধীন আত্মার আভাস পাওয়া যায়।

এই লেখক সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে গুগলে অনুসন্ধান চালাতেই বের হয়ে এলো অনেক অজানা তথ্য। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের জন্ম ১৮৮৩ সালে বাংলাদেশের বগুড়া জেলায়। অগ্নিসংস্কার তার লেখা প্রথম উপন্যাস। পরে তার আরও ৫টি উপন্যাস, দু‘টি গল্পগ্রন্থ একটি নাটক প্রকাশিত হয়। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দ মঠ উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন।

গুগলের তথ্য আমাকে জানায়, পেশায় আইনজীবী নরেশচন্দ্রকে নিয়ে এক সময়ে বাংলা সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা ও নীতি-নৈতিকতা বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিলো। তিনি নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে প্রাধান্য দিতেন তার উপন্যাসে।

আরেকটি তথ্যে আমার দৃষ্টি আটকে যায়। বেশ অবাকই হই জেনে,  প্রয়াত এই কথা সাহিত্যিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম প্রধান এবং জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন।

পুরনো বই কত কী জানায় আমাদের! বইয়ের তাকে নতুন বইয়ের চাপে ভুলে যাওয়া অগ্নিসংস্কার উপন্যাসটিও  আমাকে জানালো পুরনো দিনের অনেক কথা।

ছবি: প্রাণের বাংলা

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199