ফেরেননি জীবনানন্দ

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 24 Oct 2024

1915 বার পড়া হয়েছে

Shoes

না, জীবনানন্দ দাশ আর ফিরে আসেননি। দিন শেষে ক্লান্ত পাখির মতো অথবা যাত্রীশূন্য কোনো ট্রামের মতো দুলতে দুলতে শব্দ তুলে ফিরে আসেননি ঘরে। লিখেছিলেন কবিতায়, থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। সেই অন্ধকারকে ভালোবাসতেন কবি? সেই অন্ধকারেই মুখোমুখি বসতে চেয়েছিলেন বনলতা সেনের।জীবন যখন অশান্ত, ভাবনা যখন অস্থির তখন অন্ধকারের কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন তিনি, নাকি আড়াল? জীবনানন্দ দাশের বেলায় এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর খুঁজে বার করা কঠিন।

ব্যক্তিগত জীবনে ত্রস্ত ছিলেন নিঃসন্দেহে।mসমসাময়িক বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে-র চেয়ে বয়সে বড়। কিন্তু তখনও তাঁর কবিতা পত্র-পত্রিকা থেকে ফেরত আসে, নতুন কবিতা সংকলনে তাঁর নাম ছাপা হয় না। অন্য দিকে ব্যক্তিগত, আর্থিক জীবনেও পড়েছিলো অনিশ্চয়তার ছায়া। একেবারেই ভাল না লাগায় ১৯২৯ সালে বাগেরহাট কলেজের চাকরি ছেড়ে দেন। সেখা‌ন থেকে চলে যান সোজা দিল্লি। ১৯৩০ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন দিল্লী শহরের বাসিন্দা। তার পর বিয়ে করতে বরিশালে এসে আর ফিরে গেলেন না। বিয়ের কয়েক মাস আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন হুট করেই। আর তখন থেকেই তাঁর দাম্পত্য জীবনে সঙ্কট শুরু হয়। যা আর কখনও মেটেনি।

ভাইয়ের ছেলে অমিতানন্দের খুঁজে পাওয়া একটি ডায়রিতেও দেখা যায়, সেই অস্থির জীবনের ছায়া। সেখানে লিখছেন এক জায়গায়, ‘বাড়িতে থাকতে রোজি সন্ধ্যার পর ভাবতাম একটু অন্ধকারে থাকা যাক—জ্যোৎস্না বা লম্ফের আলোতে—কিন্তু একটা না একটা কারণে রোজি আলো জ্বালতে হত—তারপর মেসে চলে গেলাম সেখানে roommate দের জন্য আলোর ব্যবস্থা না হলে চলত না—’ আবার আরেক জায়গায়, ‘চিরদিন দুঃখ ভোগ করে যাওয়াটাই তো জীবনের উদ্দেশ্য নয়...’

মামাবাড়ির ছাদ থেকে দেখা রাতের আকাশ আর নক্ষত্রেরা যেন আজীবনের বন্ধুত্ব তৈরি করেছিলো তাঁর সঙ্গে, পরে সেই নক্ষত্রপুঞ্জই ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতার খাতায়। শব্দের পরে শব্দে, দূরতম নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে আলো এসে পড়ছে যেন, আর তাতে ভেসে যাচ্ছে আকীর্ণ চরাচর! শুধু প্রকৃতি নয় মানুষের সঙ্গে এক গভীর যোগাযোগের শুরুটাও তার সেই বরিশাল থেকেই। যেখানে অবশ্যম্ভাবী ভাবে চলে আসেন ফকিরের মতো দরিদ্র চাষি বা সকালে প্রতিদিন বাড়িতে দুধ দিতে আসা প্রহ্লাদের মতো মানুষেরা। বর্ষাকালে উঠোনে বড় ঘাস জন্মেছে। কেউ ফকিরকে ডেকেছেন সেই ঘাস কাটার জন্য। ফকির কাস্তে চালিয়েছেন আর তাতে কাতর হয়েছেন জীবনানন্দ। তখন ফকির তাঁকে বুঝিয়েছেন, ‘‘চিন্তা করবেন না দাদাবাবু। এর পরেই কচি, সবুজ, নতুন ঘাস হবে।’’ বাড়িতে দুধ দিতে আসা প্রহ্লাদ দাঁড়িয়ে পড়েছেন। জীবনানন্দ তখন ইংরেজিতে বা বাংলায় হয়তো কোনও কবিতা আবৃত্তি করছেন। পড়া শেষ হলে প্রহ্লাদ তাঁকে বলছেন, ‘আপনি বড় ভাল পড়েন দাদাবাবু।’ যদিও সে কবিতার অর্থ বুঝতে পারার কথা নয় প্রহ্লাদের, কিন্তু সেই শব্দধ্বনিই মুগ্ধ করেছিলো তাকে। কিন্তু পরে যখন দেখেছেন তাঁর নিজস্ব মনন ক্ষেত্রের সঙ্গে বাইরের জগতের কোনও মিল নেই, তখন তিনি গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে, একটা বর্ম তৈরি করেছেন! সেই বর্ম ভাঙতে পেরেছিলো কি কেউ?

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত কবির সেই নিষ্ক্রমন, ধূসর জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখার বর্মটি কেউ ভাঙতে পারেনি। আগের দিনই রেডিওতে ‘মহাজিজ্ঞাসা’ কবিতাটি পাঠ করেছিলেন। প্রতি দিনের মতো ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর হাঁটার অভ্যাস তৈরি হয়েছিলো। বাল্যকালের সেই স্টিমারের জেটি। কিছুটা দূরে ঝাউয়ের সারি। লিচু, অজস্র ফুল-ফল সমারোহে বিশাল কম্পাউন্ড নিয়ে ব্রাউন সাহেবের কুঠি। সে সব পার হয়ে ব্রাহ্ম সমাজ সার্কিট হাউসের গির্জা, তা ছাড়িয়ে গেলে শ্মশানভূমি, লাশকাটা ঘর। সে সব পথ হাঁটতে হাঁটতে আকাশে মেঘ দেখে বালক জীবনানন্দ ভাইকে বলতেন, তিনি একটা মনপবনের নৌকা তৈরি করবেন। সে দিনও কি জীবনানন্দ আকাশে মেঘ দেখে মনপবনের নৌকার কথা ভাবছিলেন? না হলে কেনো ট্রামের অবিরাম ঘণ্টা বাজানোর আওয়াজ, ট্রাম চালকের চিৎকার শুনতে পাবেন না তিনি! ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর জখম জীবনানন্দকে রাস্তা থেকে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন অপরিচিতেরা। সেখানেই আট দিনের লড়াই।মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিলো, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে’।

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199