পঞ্চাশ বছর পরে (শেষ পর্ব)

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 5 Oct 2023

8235 বার পড়া হয়েছে

Shoes
দীপারুণ ভট্টাচার্য

পাঁচ.

এদেশে এসে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। মামার ছিল কাপড়ের ব্যবসা। তার নিজের ছেলেদের পড়াশুনোয় মাথা ছিলনা এতটুকু। তাই মেধাবী ভাগ্নেকে পেয়ে মামা যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন। তার পড়াশুনার সবটাই মামার দয়াতে। এই জন্য মামাকে মামিমার কাছে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। অভাবের সংসারে তখন স্বামী হারা বোন আর ভাগ্নের খাওয়া পরাটাই একটা বিরাট বিষয় ছিল। তার উপর ভাগ্নের পড়াশুনা। অমলের মা রমলা কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে গেলেন মামার দোকানের বিনি পয়সার কর্মচারী। কথা গুলো ভাবলে এখন অবাক লাগে। বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ডাক্তার ছেলেকে দেখে খুশি হতেন! আর বাবা; মা নিজেই তো দেখে যেতে পারলেন না ছেলের এই জীবন! ডাক্তারির সেকেন্ড ইয়ারেই মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর পাশ করার পরে পরেই চলে গেলেন মামা নিজে। তখন তার ছেলেদের মধ্যে ব্যবসা নিয়ে মারামারি। মামিমার দায় নিতে রাজি হল না তার নিজের সন্তানরা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মামিমা অমলের কাছেই ছিলেন। অমল তার মায়ের জন্য কিছু করতে পারেনি। সেই আফসোস খানিকটা মিটিয়ে ছিল মামিমার সেবা করে। আজ ভবানীপুরের বাড়ি, গাড়ি, সম্মান, ছেলে মেয়ের বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাত্রার কথা মনে এলেই অমলেন্দু বাবু সেই একাত্তরের দিনগুলোর কথা চিন্তা করেন। মানুষের জীবন কি গভীর রহস্যময়! এক রহস্য থেকে বেরিয়ে আর এক নতুন রহস্যের মধ্যে পড়ে যাওয়াটাই বুঝি জীবনের নিয়ম। 

-“স্যার, একটা কথা ছিল”।

অমলেন্দু বাবু মুখ তুলে দেখলেন, তমাল দাঁড়িয়ে আছে। এই ছেলেটাকে দেখলেই তার মন ভালো হয়ে যায়। তমালের বাবা ছিলেন একজন ডাব বিক্রেতা। মা কাজ করতেন লোকের বাড়িতে। তমালকে তিনি নিজের হাতে তৈরি করেছেন। তরুণ ডাক্তারদের মধ্যে তমালের মতো প্রতিভাবান ছেলে তিনি তার শিক্ষক জীবনে দেখেন নি।

-“কি হয়েছে তমাল?” বই থেকে মুখ তুলে বললেন তিনি।

-“আজ আমার একটা ক্রিটিক্যাল অপারেশন আছে স্যার। কেমন যেন নার্ভাস লাগছে। আপনি সঙ্গে থাকলে ভরসা পাবো”।

অমলেন্দু বাবু একটু হেসে বললেন, “জীবন মৃত্যু আমাদের হাতে নেই তমাল। ডাক্তারের কাজ হল সে যা শিখেছে সেটা নিয়ে রুগীর পাশে থাকা। চিন্তা করো না অপারেশন খুব ভালো হবে”। কথাটা বলে মনে মনে হাসলেন অমলেন্দু বাবু। তমালের মুখে এখন তিনি তার তরুণ বয়সের ছায়া দেখতে পারছেন। তমাল আজ একজনের গালার টিউমার অপারেশন করবে। বেশ অনেকখানি অংশ কেটে বাদ দিতে হবে। এই অপারেশন তমালের জন্য একটু কঠিন বটে তবে অসম্ভব নয়। রুগীকে অবশ্য অমলেন্দু বাবু দেখেন নি। সার্জেন দেবরাজ রায় দেখছিলেন কেসটা। আজ সকালে হঠাৎ তার মা মারা যেতেই কেসটা তমালকে দেওয়া হয়েছে। তমাল আমতা আমতা করে বলল, “স্যার কেসটা ইন্টারন্যাশনাল। কিছু একটা যদি হয়ে যায়…”

উঠে পড়লেন অমলেন্দু বাবু। তমালের পিঠে হাত রেখে বললেন, “তুমি আমার নাম না ডুবিয়ে ছাড়বে না দেখছি। চলো তোমার ইন্টারন্যাশনাল কেস দেখে আসি। আমি কিন্তু কাঁচি ধরবো না, এ আমি আগেই বলে রাখলাম”।

-“না না স্যার, আপনি শুধু সঙ্গে থাকলেই হবে। আমি ঠিক করে নেবো”।

অমলেন্দু বাবু এসে দেখলেন ওটি একেবারে তৈরি। অ্যানেসথেটিক ডাক্তার সামন্ত রেডি হয়েই অপেক্ষা করছেন। ওটিতে এসে রুটিন মাফিক কাগজ পত্র দেখতে লাগলেন অমলেন্দু বাবু। লোকটার নাম শেক সিরাজুল। বয়স পঁচাত্তরের উপরে। তরুণ ডাক্তার তমাল নন্দীকে দেখে তার বাড়ির লোকের ভরসা হচ্ছিল না। এখন অমলেন্দু বাবুকে দেখে তারা ভরসা পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। ওটিতে আসার আগে রুগীর বাড়ির লোকদের সঙ্গে একটু কথা বলে নেওয়া অমলেন্দু বাবুর বহুদিনের অভ্যাস। এবার তিনি টিউমারের জায়গাটা দেখলেন। তারপর রোগীর চোখের নিচটা দেখলেন ভালো করে। হা করিয়ে দেখলেন মুখের ভিতরটা। এমন সময় সিরাজুল অমলেন্দু বাবুর হাত ধরে বললেন, “আমি বাঁচবো ডাক্তার সাহেব?”

-“নিশ্চয়ই বাঁচবেন। এ আর এমনকি। কদিন পরেই দেশে ফিরে আনন্দে থাকবেন। এখন আল্লার নাম করেন”।

-“আপনার কথা শুইনে শান্তি পালাম” চোখ বন্ধ করে বলল সিরাজুল।

চোখের ইশারায় ডাক্তার সামন্তকে অ্যানেসথেসিয়া চালু করতে বলে অমলেন্দু বাবু প্রশ্ন করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?”

-“বাংলাদেশে!”

এই সময় রোগীকে নানান প্রশ্নে ভুলিয়ে রাখাই দস্তুর। ধীরে ধীরে তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন।

-“বাংলাদেশের কোথায়?” প্রশ্ন করলেন অমলেন্দু বাবু।

-“নড়াল!”

-“নড়াইলের কোথায়?”

-“নবগঙ্গার পাড়ে আমাগো গ্রামের নাম ব্রাহ্মণডাঙ্গা” কথার শেষটায় কেমন জড়িয়ে গেল।

সেই জড়ানো গলা শুনেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো অমলেন্দু বাবুর। মুখটা তার আবছা যেন মনে পড়ে গেল! তিনি তাড়াতাড়ি লোকটার হাতের দিকে তাকালেন। আঙ্গুলের সংখ্যা ছয়। তার হার্টবিট বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। চাদর সরিয়ে অন্য হাতটাও দেখতে হবে তাকে। দেখলেন। ভুল নেই কোথাও; এই সেই ছয় আঙ্গুলের নাপিত। যুদ্ধের পরে অনেকেই এনিমি প্রপার্টির মালিক হয়ে জীবন বদলে ফেলেছেন। কে জানে, সেই দিনের নাপিত আজ হয়তো কোটি টাকার মালিক।

মুহূর্তে চোখের সামনে জীবনের সেই বীভৎস নাটকটা আবারও অভিনীত হতে দেখলেন অমলেন্দু বাবু। বাবার কাটা মুণ্ডটা ডুঙ্গির ভিতরে গড়াচ্ছে তার পায়ের কাছে। আর ধড়টা কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যাচ্ছে বিলের জলে। বিলের জল লাল হয়ে যাচ্ছে তার বাবার রক্তে। তার শরীরের ভিতর থেকে ছোট্ট অমল লাফ দিয়ে বেরিয়ে তারই সামনে দাঁড়িয়ে আছে এখন। আজ পঞ্চাশ বছর পরেও সে একই রকম অসহায়। ছোট্ট অমল আজ এই বৃদ্ধ অমলেন্দুর দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে, “ওরা বাবাকে মেরে ফেলল”। মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল সব কিছু। সম্বিত ফিরে পেয়ে অমলেন্দু বাবু দেখলেন, তমাল তাকে চেয়ারে এনে বসিয়েছে।

-“কি হল স্যার?” ওটি রুমের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে অমলেন্দু বাবুর দিকে। তিনি ধীরে ধীরে উঠে চোখে জলের ঝাপটা দিলেন। স্মৃতির কাছে দুর্বল হয়ে লাভ নেই। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সিরাজুলের দিকে। তাকিয়ে দেখলেন সেই মানুষটাকে, যে একদিন তার বাবাকে হত্যা করেছিল। মনে মনে বললেন, “বাবা, তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো, আমি যেন নিখুঁত ভাবে অপারেশনটা করতে পারি”।

এরপর তমালের দিকে ফিরে বললেন, “এই অপারেশনটা আমিই করবো তমাল; আজকে তোমাকে ছুটি দিলাম”। (শেষ)

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199