পৃথিবী আর সূর্য‘র মাঝখানে এক কবি

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 7 Nov 2024

1965 বার পড়া হয়েছে

Shoes

প্রতি মুহূর্তে তিনি নিজেকে নতুন করে নিতে চাইতেন। যত বয়সের ভার চেপে বসেছে ততই তার কবিতা যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে নতুন ভ্রমণের কথা বলেছে। ক্ষেত্র পাল্টেছে, ছবি পাল্টেছে, বদলে গেছে দেখার চোখ। কবি অরুণ মিত্রের কবিতা যেন সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে রোদ মেখে নিয়ে পথ চলতে চেয়েছে। চলেছেও। কবি নিজেই তরুণ সময়ের সঙ্গে থাকতে চেয়েছেন। তাই নব্বই বছর উৎরে এসে লিখেছেন প্রেমের কবিতা।
আপাত নিরীহ দর্শন মানুষ ছিলেন অরুন মিত্র। প্রকৃতির পর্যক্ষণ তার কবিতাকে ঘিরে থাকলেও গভীরে তিনি বাঁচিয়ে রাখতেন আত্ম-জিজ্ঞাসা, অসাম্যের প্রাচীরকে আঘাত করার আকাঙ্ক্ষা, আর আত্মদংশনের আগুন। আর তাই হয়তো তিনি অনায়াশে লিখতে পারেন,

দেবতার ক্রোধ;
কুৎসিত রীতিমতো;
মানুষেরা, হুঁশিয়ার;
লাল অক্ষরে লটকানো আছে দেখো
নতুন ইস্তাহার। (লাল ইস্তাহার)

অরুণ মিত্র ছিলেন রবীন্দ্র উত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা কবি এবং ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও অনুবাদক। তিনি বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে ছিলেন অধ্যাপক। ষোলো বছর বয়সে 'বেণু' নামে একটি কিশোর পত্রিকায় প্রথম অরুণ মিত্রের কবিতা প্রকাশিত হয়। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলি হল প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫০), ঘনিষ্ঠ তাপ(১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে মাটিতে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮১) ও খুঁজতে খুঁজতে এতদূর (১৯৮৬)। শুধু রাতের শব্দ নয় কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং খুঁজতে খুঁজতে এতদূর কাব্যগ্রন্থটি ১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়।  

কবিতার আত্মার ভিতরে প্রাণটাই আসল কথা। অদৃশ্য হয়ে ওই প্রাণটুকু যতক্ষণ ভিতরে জেগে থাকে ততক্ষণই কবিতা বাঁচে। মার্কসবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী অরুণ মিত্রের কবিতার অন্দরমহলে বেঁচে থাকা সেই আলো বারংবারই আমাদের পাঠের পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। ফিরে তাকালে তার লেখা ‘কসাকের ডাক’ কবিতায় আমরা উপলব্ধি করতে পারি তিনি ওই সময়ে ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে কৃষিজীবী, শ্রমজীবী মানুষের কানে তার কবিতার ভিতর দিয়ে পৌঁছে দিতে চান রুশ দেশের মাটিতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের গল্প। কবির আন্তর্জাতিকতা বোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আবার পৃথিবী জুড়ে এক ধ্বস্ত সময়ের জ্বালা যন্ত্রণার মাঝেই তার কবিতার শব্দবন্ধ নিপুন ভাবে প্রকাশ করে তার নাগরিক চেতনাকেও। পাঠককে চমকে দিয়ে তিনি লেখেন স্পর্শের কথাই বলছি। শুধু নারী নয়, এই স্পর্শ বন্ধুত্বের, পাখি, পতঙ্গ গাছপালায়, রাস্তার অচেনা শিশু, কাজের মেয়ে পিয়ারিয়া, বাজারের ব্যাগ হাতে একসঙ্গে সবজিবাজারে ঘোরা প্রতিবেশী, জুতা সারাইয়ের মুচির কথাও। তার কবিতা পাঠ করে উঠে মনে হয় এক গভীর আবেগের শরীরে হাত রাখা ছিলো কিছুক্ষণ আগে। সেই আবেগের ভিতরে প্রবাহিত হচ্ছে সম্পূর্ণ এক জগৎ। এই সম্পূর্ণ জগতের কাছে পৌঁছানোর জন্য তীব্র এক তাড়না কাজ করেছে অরুণ মিত্রের কবিতায়।
তিনি কবিতায় লিখেছেন, মাটির পাত্রটাকে আমি জানকবুল আঁকড়ে আছি। তাকে কি আমি ছাড়তে পারি, আমার সর্বস্বকে? পড়তে পড়তে বিষ্মিত হই। আরে, এই মাটির পাত্রটাই তো পৃথিবী। নতুন রোদের প্রত্যাশী এই কবি তো পৃথিবী আর সূর্য’র মাঝখানে তৈরি করে ফেলেছেন গভীর এক সেতুবন্ধ। এখানেই কবি অরুণ মিত্র আলাদা। এখানেই লুকিয়ে আছে তার কবিতার বেঁচে থাকার মন্ত্র।২রা নভেম্বর ছিলো কবি অরুণ মিত্রের জন্মদিন।

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199