নেমে আসে গঙ্গা

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 25 Apr 2019

1990 বার পড়া হয়েছে

Shoes
এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

একটা হালকা তর্ক সবসময় থাকে যে উপরে সত্যিকারের গঙ্গা আসলে কোনটা-অলকানন্দা, না ভাগীরথী? এটা সত্যি যে দেওপ্রয়াগ-এ এসে দুটো নদী মিশে একক গঙ্গা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন ভৌগলিকভাবে অলকানন্দাই গঙ্গা, আবার কেউ বলেন জনপ্রিয় বিশ্বাসটাই আসল, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ভাগীরথীই গঙ্গা।
বন্ধু ড. সুধাকর মিশ্র-এর কাছে প্রশ্নটা রাখি। ইনি প্রায়শই জ্ঞানের কথা বলে থাকেন। উনি সমস্যার সমাধান দিলেন, বললেন,অলকানন্দাই গঙ্গা, তবে ভাগীরথী হলো গঙ্গা-মা।
মন যা বিশ্বাস করে মানুষের চোখ তাই দেখে। ভাগীরথী প্রায় আদরণীয় পর্যায়ের সুন্দর। যেই থেকে ভগবান শিব তাঁর জটা থেকে দেবতাদের জলাধার অবমুক্ত করে দিয়েছেন এবং তার ধারা সমতলে যুবরাজ ভাগীরথের রথচিহ্ন ছুঁয়েছে তখন থেকেই এর প্রতি মানুষ ভক্তি ওভালবাসা নিয়ে আকৃষ্ট হয়েছে।

‘নদীটিকে ধারণ করেছিলেন তাঁর মাথায়,
বইয়ে দিয়েছিলেন তাকে প্যাঁচালো পথে,
হিমালয়ের ছিটিয়ে থাকা জঙ্গলে,
আর তাঁর চুলের জটায়।’

হিন্দুদের শ্রদ্ধা ও অন্যদের ভালবাসা নিয়ে দেবী গঙ্গা সবার উপরেই তার মোহ বিস্তার করেন। তদুপরি এর উৎপত্তি হিমালয়ের ঠিক হৃৎপিণ্ড থেকে। ১৮২০ সালে গাঙ্গোত্রি ভ্রমণে এসে পর্যটক বেইলি ফ্রেজার বর্ণনা করেন: ‘আমরা এখন হিমালয়ের ঠিক কেন্দ্রস্থলে, সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে এবড়ো খেবড়ো ও উঁচু পার্বত্য এলাকায়।’
তাঁর উপলব্ধিটা হয়তো এরকম ছিলো যে আপনি এমন এক জায়গায় রয়েছেন যেটি সৃষ্টির শুরুর সময় থেকে রয়েছে, আপনি সেখানেই দাঁড়িয়ে-এ এক ভিন্ন ধরনের গর্বানুভূতি আদিমকে ছুঁতে পারার বিরল আনন্দের, বিশেষ করে এই নদী-উপত্যকাটির সান্নিধ্যে আসার ব্যাপারটি। আমার কাছে, এবং আরো অনেকের কাছে, যারা পাহাড়ে এসেছেন, গাড়োয়ালের চারটি নদী-উপত্যকার মধ্যে ভাগীরথী হলো সবচাইতে সুন্দর। এই সৌন্দর্য অটুট থাকবে যতদিন আমরা নদীর পানি কলুষিত করবোনা আর এর আদি-বনভূমি অক্ষত থাকবে।
সৌন্দর্যের উপকরণ যেন সবটুকুই রয়েছে ভাগীরথীর-এর সৌম্য-শান্ত রূপ, গভীর সংকীর্ণ উপত্যকা, ঘন বনাঞ্চল, উন্মুক্ত উপত্যকায় স্তরে স্তরে বিন্যস্ত আবাদ, মাথায় তার বরফের শিরস্ত্রাণ।
তেহরি-এর মাইল পঁচিশেক উপর থেকে উপত্যকা জুড়ে পঞ্চান্ন মাইল অব্দি রয়েছে পাইনের বিস্তীর্ণ বনভূমি সুদূর ভাটওয়ারি পর্যন্ত। এই বনভূমি নদী ও উপনদীগুলোর দুই ধারের পাহাড়-পর্বত পর্যন্ত বিস্তার করে আছে, আরো আছে সংকীর্ণ গিরিখাত, মালভূমি সব নিয়ে ৫,০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত। ভাটওয়ারির উপর থেকে বক্স, ইউ, সাইপ্রেস, ইত্যাদি বৃক্ষের মেলা শুরু হয়ে যায়। আর যদি আমরা উপত্যকা ছেড়ে ৯,০০০ ফুটে অবস্থিত ছোটো হ্রদ নচিকেতা তাল্ বা দোদিতাল্-এর দিকে এগোই তো আমরা ওক্ ও চেস্টনাট-এর গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাবো। গংনানি থেকে গাঙ্গোত্রি পর্যন্ত দেবদারু হলো প্রধান বৃক্ষশোভা। গাঙ্গোত্রির উপরে উপত্যকার আট মাইল উচ্চতা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে একসেলসিয়া পাইন। হিমবাহের আধামাইল পর্যন্ত আশেপাশে থোকা থোকা দেখা মেলে বার্চ বৃক্ষের।
নদীর দক্ষিণ পারে, সুকনি-এর উপরে শুধুই দেবদারুর বন; কিন্তু উত্তর পারে রূপালি ফার, স্প্রুস, আর বার্চ-এর মিশ্রণ। জাডগঙ্গা উপত্যকাও দেবদারু দিয়ে ভরা, তবে উপরের দিকে রয়েছে মূল্যবান পেনসিল সিডার মাথা উঁচু করে। গাড়োয়ালের আর যে জায়গাটিতে দেবদারুর প্রাচুর্য রয়েছে সেটা হচ্ছে দক্ষিণের দিকে জৌনসার বাওয়ার।
মূল্যবান দেবদারু কাঠের আকর্ষণে অভিযাত্রী ফ্রেডেরিক ‘পাহাড়ি’ উইলসন এই উপত্যকায় এসেছিলেন ১৮৫০ সালে। তিনি তেহরি-এর রাজার কাছ থেকে বন ইজারা নিয়েছিলেন ১৮৫৯ সালে পাঁচ বছরের জন্য। ওই সময়ের মধ্যে সম্পদ বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
ধারাসু, ভাটওয়ারি ও হারসিল-এর পুরনো রেস্টহাউজগুলো উইলসন সাহেবই বানিয়েছিলেন। এগুলো ভ্রমনকারীদের বিশ্রামস্থল হিসেবে বানানো হয়েছিলো, কারণ তখন এক গ্রাম থেকে অপর গ্রামে যাবার জন্য সরু এক চিলতে পথ শুধু ছিলো। উইলসন মুখবা নামক গাঁয়ের গুলাবি নামের এক স্থানীয় মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। এখানকার ছোটো ছোটো মজবুত বাংলোগুলোতে এখনো উইলসনের মুখাবয়বের আলোকচিত্র ঝুলতে দেখা যায়। অন্তত ভাটওয়ারিতে আমি সেরকম আলোকচিত্র দেখেছি।
হারসিলে এখন আর সাধারণের যাতায়াত নেই, এবং আমার ধারণা পুরনো বাড়ি-ঘরগুলোর বেশ কিছু বছর আগের এক অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভুত হয়েছে। আমি যে মজবুত বাড়িটিতে এসেছি সেটি ১৯৯১ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প সহ্য করে টিকে আছে।
অনেক কিছুর সঙ্গে উইলসন এই এলাকায় প্রথমবারের মতো আপেল গাছ লাগান। ‘উইলসন আপেল’ নামে খ্যাত বৃহদাকার রসালো ও লাল আপেল এখন গাঙ্গোত্রির পথে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের রসনা তৃপ্ত করে। এই চমৎকার মানুষটির অঞ্চলটির বন্যপ্রাণীদের সম্পর্কে জ্ঞান ছিলো বিস্ময়কররকম। তাঁর লেখা ১৮৬০ সালের দিকে ‘ইনডিয়ান স্পোর্টিং লাইফ’ নামের পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিলো। তথাকথিত বন্যপ্রাণী বিষয়ক অপরাপর লেখকরা পরে সেখান থেকে সুবিধা নিয়েছেন।
উইলসনের আরেকটি উদ্যোগ ছিলো সেতু নির্মাণের। এসব সেতু নির্মাণের কারণ ছিওেলা হারসিল ও গাঙ্গোত্রির মন্দিরে যাবার সুবিধা করে দেয়া। ওগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যেটি সেটি ছিলো ভাইরঙঘাট-এ জাটগঙ্গার উপর ৩৫০ ফুট একটি ঝুলন্ত সেতু। তরুণ ভাগীরথীর ১২০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় নদীটি সেখানে একটা সরু গিরিখাত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই দোদুল্যমান সেতুটি প্রথম দিকে ভ্রমণকারীদের জন্য আতঙ্কের বিষয় ছিলো এবং খুব অল্পজনই ওতে চড়তে সাহস করতো। জনগনকে সাহস জোগাতে উইলসন প্রায়ই ঘোড়ায় চেপে সেতুর এমাথা ওমাথা করতেন। সেতুটি কালে ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু স্থানীয়রা বলে পূর্ণিমার রাতে নাকি এখনো সাহেবের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যায়। পুরনো সেই সেতুর ভিত্ ছিলো আস্ত গাছের গুঁড়ি। সেতুর একপ্রান্তে এখনো তার কিছু অবশিষ্ট আছে। ওখানে এখন নর্দান রেলওয়ে-এর ইঞ্জিনিয়াররা মোটরগাড়ি চলার পাকা সেতু বানিয়ে ফেলেছে।
আকর্ষণীয় জীবন উইলসনের, তঁকে নিয়ে কিছু লেখা হয়নি বটে, কিন্তু তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকবে-এবং তা আছে শতবছরের বেশি সময় ধরে। তাঁর কোনো স্মারক নির্মিত হয়নি, তবে ওই অঞ্চলের মানুষেরা তাঁকে একধরনের সমীহ মিশ্রিত ভয় নিয়ে স্মরণ করে, তাঁর সম্পর্কে এমন ভাবে বলে যেন তিনি এইতো সেদিনও বেঁচে ছিলেন। কিছু মানুষ তাদের জীবদ্দশায় এমন কিছু করে যান যা তাদেরকে কিংবদন্তীর পর্যায়ে নিয়ে যায়। এসব মানুষ যেখানে বসবাস করেন সেখানে তারা তাদের আত্মাকে মিশিয়ে দিয়ে যান, যা সেখানকার পাহাড়, নদীর অংশ হয়ে বেঁচে থাকে।
পুরনো দিনে কেবল কট্টর তীর্থযাত্রীরাই গাঙ্গোত্রি ও যমুনোত্রি-এর মন্দিরে আসতো। সেসব দিনে পথ ছিলো অসম্ভব পাথুরে ও বিপদজনক, কোথাও কোথাও সাপের মতো পেঁচিয়ে, কোথাও উঁচুতে উঠে, আবার কোথাও ঢাল হয়ে নেমে এসে কোনো গভীর খাদের পাশে চলে আসতো তা। কখনো আবার ভূমিধ্বস নেমে এসে পুরনো রাস্তা ঢাকা পড়ে যেতো আলগা পাথর আর মাটিতে। পথ চলতে হতো তারই উপর দিয়ে। উত্তরকাশীর উপরে আজো কোনো বড় শহর নেই, হয়তো একারণে এই অঞ্চলে জনাধিক্য কম, ফলে এখানকার বনাঞ্চল অলকানন্দা উপত্যকা বা তার নিচে যেকোনো জায়গার চাইতে অনেকটাই সুরক্ষিত।
গাঙ্গোত্রির অবস্থান ১০,৩০০ ফুটের কিঞ্চিত উপরে। নদীটির ডান তীরে গাঙ্গোত্রি মন্দির। প্রচুর কারুকার্য বিহীন এই ছোট্ট কিন্তু সুন্দর মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন অমর সিং থাপা নামে এক নেপালি জেনারেল উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। জয়পুরের মহারাজা ১৯২০ সালে মন্দিরটির সংস্কার সাধন করেন। যে শিলাখণ্ডের উপর মন্দিরটি দাঁড়িয়ে সেটির নাম ভগীরথ শিলা। কথিত আছে যে যুবরাজ ভগীরথ এর উপরে প্রার্থনামগ্ন ছিলেন হিমালয়-চূড়ার চিরনিবাস থেকে গঙ্গাকে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য।
এখানে শিলাস্তুপ কাটা-ঘষার কাজ করে পানির স্রোত, আর বরফ। শিলাপাথরের গায়ে সিল্কের মসৃণতা দেখা যায়। এখানটাতে নদী দুরন্ত ও প্রবল বেগে ছুটে যায়, কিন্তু তা একবারেই শিথিলহয়ে যায় পনেরশ মাইল দূরে গিয়ে বিস্তির্ণ চওড়া হয়ে, যখন বয়ে আনা পানি সে বিসর্জন দেয় বঙ্গোপসাগরে।
বিশাল এক হিমবাহের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে এই নদী, হিমবাহটি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আলগা পাথর ও মাটিতে পেরেকবিদ্ধ হয়ে যেন আটকে আছে। হিমবাহটি চওড়ায় মাইলখানেক, তবে উপরে তা অনেক মাইল অব্দি বিস্তৃত। হিমবাহের যে বিদীর্ণ মুখটি থেকে পানির ধারা বেরিয়ে এসে আলোর মুখ দ্যাখে তার নাম হলো গৌমুখ বা গোরুর মুখ। হিন্দুদের কাছে এটি ভীষণ পবিত্র। আশেপাশের চিরতুষারের অঞ্চল ঘিরে কতোইনা ভক্তি মিশ্রিত রহস্য।
পৃথিবীর কাছে প্রথম মুখ-প্রদর্শনের চেহারাটি গঙ্গার নেহায়েৎ পুঁচকে নয় বটে, তার পরেও বরফের গর্ভ থেকে সদ্যজাত নদীটি প্রস্থে তিরিশ বা চল্লিশ গজের বেশিও নয়। গাঙ্গোত্রি মন্দিরের নিচে গৌরি কুণ্ডে এই নদী এক মস্ত শিলাখণ্ডের উপর পতিত হয়, তারপর তা ধাপে ধাপে জলপ্রপাতের মতো বয়ে যেতে থাকে যতক্ষণ না তা ভাইরঙঘাটি গিরিখাদে পৌঁছায়।
জলপ্রপাতের শ্রবনসীমার মধ্যে নদীকিনারে রাত্রিযাপন দারুণ এক গা ছম্ছমে আভিজ্ঞতা। একসময়মনে হয় এটি যেন একটি নয়, শত প্রপাতের মিলিত নিনাদ। শয়নে ও স্বপনে এই আওয়াজ মূর্ত হয়ে থাকে। গাঙ্গোত্রিতে সূর্যোদয় দেখার আশায় ভোরে ওঠা অর্থহীন, কারণ আশেপাশে ঘিরে থাকা পর্বতমালা সূর্যকে আড়াল করে রাখে সকাল নয়টা পর্যন্ত। সবাই সকালে উঠে পড়ে ‘গোলাপি শীতল’ পরশ নেবার জন্য। আমার কাছে গোলাপি পরশের চাইতে গোলাপি রোদে চামড়া পোড়ানো বেশি কাম্য, তাই আমি সূর্যরশ্মি নদী পেরিয়ে না আসা পর্যন্ত বেলা করে শুয়ে থাকি মোটা লেপের তলে। এখন মাঝ অক্টোবর, দিওয়ালির পরে মন্দির ও ছোট্ট শহরখানি শীতের কারণে বন্ধ হয়ে যাবে, পণ্ডিতরা অপেক্ষাকৃত উষ্ণাঞ্চল মুকবাহ্-এ চলে যাবেন। সহসাই সবকিছু তুষারাবৃত হয়ে যাবে, এবং কষ্টসহিষ্ণু বেগুনিপালকের শিস্ দেয়া ছোট্ট পাখিরাও উপত্যকা থেকে নিচে নেমে যাবে। এবং নিচে বনাঞ্চলের পরে কৃষকেরা হলুদ, সবুজ ও সোনালি রঙের স্তর বিশিষ্ট খেত থেকে ফসল কাটবে, নিচেই নদীর গাঢ় সবুজ।
সত্যিই, ভাগীরথীর পানি সবুজ। দারুণ গভীর ও দ্রুতবহা হওয়া সত্ত্বেও এই নদী তার সৌন্দর্য হারায়নি। চলার পথে সে আচমকা ছুটে চলে না বা থমকে দাঁড়ায় না, যা করে গোত্তা খেয়ে চলা অলকানন্দা তার পাথুরে পেট বেয়ে ফেনা ও ঘূর্ণি তুলে তুলে। অলকানন্দা আপনাকে একটা আটকে পড়া ভাবের অনুভূতি দেবে। ভাগীরথী স্বচ্ছন্দে বয়ে যাওয়া নদী, যার চলার গোটা পথ যেন মসৃণ ও সমউচ্চতার।
উত্তরকাশী বড়ো ও বর্ধিষ্ণু শহর হলেও এখন পর্যন্ত মানুষের ভিড় নেই এখানে। হৃষিকেশ বা দেরাদুনের অংশবিশেষের মতো জরাজীর্ণ দশা এখানে হয়নি। এখনো এখানে কেউ চাইলে দীর্ঘ বাজারের পথ ধরে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটতে পারে পথে কারো কনুইয়ের গুতো না খেয়ে বা কোনো ত্রি-চক্রযানের সঙ্গে সংঘর্ষ না ঘটিয়ে। এখানেও নদী আপনার সঙ্গে থাকবে সারাক্ষণ, ওর নুড়ি বিছানো তলদেশ বেয়ে গড়িয়ে যাওয়ার গুঞ্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে আপনাকে।
উত্তরকাশী তার নিজস্ব ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ববাহী বিষয়ে খুব বঞ্চিত নয়, যদিও প্রাচীন শহর বারাহাটের আর কিছুই তেমন অবশিষ্ট নেই আজ। চারটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির রয়েছে, এবং জানুয়ারির প্রথম দিকে মকর-সংক্রান্তির সময় সপ্তাহব্যাপি মেলা বসে এখানে। তখন আশেপাশের অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ভিড় জমায় শহরটিতে। ঢোল বাজিয়ে, ট্রামপেট ফুঁকে সুন্দর সাজের পালকিতে চড়িয়ে দেব-দেবীদেরকে নিয়ে আসা হয় মেলা প্রাঙ্গনে। প্রতিবেশী গা-গ্রাম শূন্য হয়ে যায় সেদিন, যেহেতু সবাই মন্দির, স্নান-ঘাট আর মেলার আনন্দমেলা উপভোগের জন্য ছুটে আসে।
জনবহুল শহর তেহরি যেতে হলে নদীর পথ ধরে নিচে নামতে হবে আমাদেরকে। উত্তরকাশী থেকে এই শহরটি বেশ আলাদা। সমতলের একটা শহরের সব বৈশিষ্টই তেহরির রয়েছে-মানুষের ভিড়, হৈ চৈ, যানজট্, ধুলো-ময়লা, নোংরা খাবারের দোকান-সব। তবে এসবই ভীষণ ক্ষণস্থায়ী, কারণ তেহরির বাঁধটি তৈরি হয়ে গেলে ভাগীরথীর পানিতে শহরটির সলিল সমাধি ঘটবে। গাড়োয়ালের শাসকরা প্রায়ই তাঁদের রাজধানী বদলাতেন, এবং গুর্খা-যুদ্ধ (১৮১১-১৮১৫)-এর পরে রাজধানী শ্রীনগর যখন ব্রিটিশ গাড়োয়ালের অংশ হয়ে গেল তখন রাজা সুদর্শন শাহ্ তেহরিতে তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপন করলেন। কথিত আছে যে এই পর্যন্ত এসে তাঁর ঘোড়া থেমে গিয়েছিলো, আর এগুতে চাইছিলোনা। রাজা সেটাই মেনে নিয়েছিলেন, অন্তত লোকদের তাই বিশ্বাস।
কে জানে, বাঁধটি তৈরি হয়ে গেলে একদিন হয়তো যুবরাজ ভগীরথের রথটিও এসে এখানে থামবে। ২৪৬ মি. উঁচু মাটির বাঁধ ৪২ বর্গমাইল এলাকায় পানি ধারণ করবে, যা কিনা গোটা শহর ও প্রায় তিরিশটা গ্রামকে তলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট হবে।
আমরা শহর ছেড়ে নদীর উপরের সরু সেতুটি পার হয়ে আসি, তখন উপরে প্রবল শব্দে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে গড়িয়ে নামতে থাকে পাথর, গিরি-সংকটের দিকে। এ যেন আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়া যে বাঁধের কাজ এগুচ্ছে।
রাজার ঘোড়ার মতো তেহরিতে থেমে থাকার ইচ্ছে আমার নেই। নদীর উপরের দিকটাতে অনেক প্রাণবন্ত জায়গা রয়েছে। আর গঙ্গা, আপাতঃভদ্র নদীটি, কোনোদিন কী ফুঁসে উঠতে পারেই না তাকে এভাবে রুদ্ধ করে দেবার অপরাধে? (চলবে)

ছবি: গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199