পার্সোনাল সার্ভিস পর্ব. ১

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 30 Nov 2023

4790 বার পড়া হয়েছে

Shoes
দীপারুণ ভট্টাচার্য

 এক.

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। সুজন কৃষ্ণনগর রেল স্টেশনের বাইরে অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা রং চটা জামা কাপড়ের ব্যাগ। চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। অনেকক্ষণ একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মুখে ফুটে উঠেছে বিরক্তির ভাব। পরিচিত মুখ চোখে পড়লেই সে সরে যাচ্ছে সিগারেট দোকানের আড়ালে। বীথি যখন এলো তখন সাতটার লোকাল ট্রেন ছাড়তে আর বেশি দেরি নেই। সুজন অবাক হয়ে বললো, “এতো দেরি করলে যে?”

-“বাড়ির লোকেরা সন্দেহ করেছে। আমার ঘর তল্লাশি করেছে, জানো! নেহাত চিলেকোঠায় রেখেছিলাম; নইলে…। বাড়ি থেকে বেরোতেই দিচ্ছিলো না। আজ প্রদীপ স্যারের ক্লাস ছিলো বলে আসতে পারলাম।”

-“দাও, দাও, দেরি করলে ট্রেন চলে যাবে”।

বীথি বইয়ের ব্যাগ থেকে খুব সাবধানে রুমালে বাঁধা পুটুলিটা সুজনের হাতে দিতেই সুজন সেটা পকেটে চালান করে দিয়ে বললো, “তাহলে চলি?”

বীথির চোখ ছলছল করে উঠলো, “আমাদের আবার কবে দেখা হবে?”

-“খুব তাড়াতাড়ি। আমি ফোন করবো”।

-“কোথায় ফোন করবে; বাড়িতে? বাবা যদি ধরে তাহলে আর রক্ষা থাকবে না।”

-“আমি একটা ফোন নিয়ে তোমাকে জানিয়ে দেবো। তারপর তুমি ফোন করবে। এখন চলি”।

-“কোলকাতায় গিয়ে তুমি কোথায় উঠবে? হোটেলে?”

-“ধুর, হোটেলে থাকার টাকা কোথায়। এক বন্ধুর বাড়িতে উঠবো ভাবছি”।

-“কোলকাতায় তোমার বন্ধু আছে, আগে বলোনি তো?”

-“বলা হয় নি। এবার যেতে দাও। ট্রেন চলে যাবে”।

বীথি তবু যেন ছাড়তে চায় না। সে সুজনের হাতে কয়েকটা টাকা দিয়ে বললো, “এটা রাখো। কাজে লাগতে পারে। আমাকে ভুলে যাবে না… কথা দাও!”

শেষ মুহূর্তে দৌড়ে ট্রেনে উঠলো সুজন। বসে পড়লো জানলার পাশের সিটে। সকাল থেকেই আজ দিনটা খারাপ যাচ্ছে। অবশ্য খারাপ কাজটা সে নিজেই করেছে। যদিও এছাড়া তার আর কোন পথ ছিলো না। তবে এখন সে যে পথে চলেছে…। কপালে কি আছে কে জানে। অনেকদিনের চেষ্টার পর, কাল রাতে সে মামা মামিকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতে পেরেছিলো। তাই তাদের কোন হুস ছিলো না। সেই সুযোগে আলমারি ভেঙ্গে সোনার গয়না গুলো চুরি করে সুজন। কথাটা মনে হতেই প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিলো, ঠিক আছে। এটাই বড় সমস্যা। সঙ্গে দামি কিছু থাকলে মানুষ বার বার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। পকেটমার মানুষের হাতের দিকে তাকিয়েই বিষয়টা বুঝে ফেলে। আজ যেন তেমন কিছু না হয়। তার বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে।

ছোট বেলায় বাবা-মা মারা না গেলে তাকে কি আর আজ চুরি করতে হতো! তার মায়ের গয়না দিয়েই মামাতো বোন মিতালির বিয়ে হয়েছে। সুজন জানে। তার বাবার অফিস থেকে যে টাকা পাওয়া গিয়েছিলো তাই দিয়েই মামার কৃষ্ণনগর বাজারে মুদি দোকান করা। ছোটবেলা থেকে তাকে ভালো করে পড়াশুনো পর্যন্ত করায় নি মামা-মামি। বি.এ. সে পাশ করেছে একেবারেই নিজের চেষ্টাতে। কিন্তু এই সামান্য বিদ্যাতে কি আর চাকরি হয়। তাই মামার কাছে কিছু টাকা চেয়েছিলো সে। বাজারে একটা মোবাইল টেলিফোনের দোকান করতে চেয়েছিলো। সেই থেকেই অশান্তির শুরু। মামা বললো, “নতুন দোকান করে কি হবে। আমার দোকানে কাজ কর। আমরা চোখ বুঝলে সবই তো তোর!” এর থেকে বড় মিথ্যে যে আর নেই, সুজন জানে। তার মামাতো বোন মিতালি একটা ঘষা পয়সাও ছেড়ে দেবে না। মামার কথায় রাজি হলে, সারা জীবন মুদি দোকানের কর্মচারী হয়েই থাকতে হবে। এটাই কৃষ্ণনগর ছাড়ার কারণ। অনেক বড় বড় স্বপ্ন সুজনের। বীথিকে নিয়ে কোলকাতায় সংসার পাতবে। ছোট শহর তাকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারবে না।

“টিকিট দেখি”। চোখটা একটু লেগে এসেছিলো। সুজন তাকিয়ে দেখলো টিটিই এসেছেন। সে পকেট থেকে টিকিট বার করে এগিয়ে দিলো। ভদ্রলোক সেটা ভালো করে দেখে বললেন, “এটা তো দুপুরের টিকিট, এখন যাচ্ছো যে? এটা চলবে না। ফাইন দিতে হবে”। এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সুজন গম্ভীর গলায় ধীরে ধীরে বললো, “কোলকাতায় কাল একটা ইন্টার্ভিউ আছে স্যার। দুপুরে স্টেশনে এসে টিকিট কাটার পরে খবর পেলাম বাড়িতে এক্সিডেন্ট হয়েছে। সিলিং ফ্যান ভেঙ্গে পড়ে ছোট বোনের পা ভেঙেছে। প্লাস্টার করাতে গিয়ে সময় চলে গেলো। দুপুরে খাওয়া পর্যন্ত হয়নি। কোনো রকমে ট্রেনটা ধরেছি। এখন আপনি ফাইন দিতে বললে, আর কিছু বলার নেই স্যার”। তার কথা গুলো আশেপাশের মানুষদের কেমন ভালো লেগে গেলো। তার যে দুপুরে খাওয়া হয়নি একথা সত্যি। চোখে মুখেও একটা ক্লান্তির ছাপ পড়েছে। একজন বললো, “হ্যাঁ আমরা দেখেছি উনি দৌড়ে এসে ট্রেনে উঠলেন”। অন্য একজন বললো, “ছেড়ে দিন স্যার, বেকার ছেলে বিপদে পড়েছে”। হঠাৎ গড়ে ওঠা এই জনমতের চাপে চেকার টিকিটটা ফেরত দিয়ে শুখনো মুখেই চলে গেলেন।

সকালে থানার ডিউটি অফিসার এভাবেই তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মূলত প্রতিবেশীদের চাপে। রাত আন্দাজ দুটো নাগাদ সে মামার ঘরে ঢোকে ছাদের জানলার গ্রিল খুলে। জোগাড়টা আগেই করা ছিলো। তারপর বালিশের তলা থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলতে আর কতক্ষণ। গয়না চুরি করার কোন ইচ্ছে তার ছিলো না। হাজার পঞ্চাশ নগদ পেলেই সে বেশি খুশি হতো। আলমারিতে আজ টাকা ছিলনা বলেই মামির গহনা নিতে হলো। রাতেই পরিকল্পনা মতো জিনিস গুলো সে বীথির কাছে রেখে এসেছিলো। সাত সকলে মামা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করলেন। তারপর পুলিশ। মামা-মামি সুজনের উপরেই দোষ দেন। পুলিশ তার ঘর তল্লাশি করে যথারীতি কিছুই পায় না। ডিউটি অফিসার তাকে থানায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। তখন পাড়ার লোকেরাই এগিয়ে আসে। ‘সুজন খুব ভালো ছেলে। ওর মৃত বাবা মায়ের টাকাতেই মামা মামি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ছোটবেলা থেকে ওর উপর অনেক অত্যাচার হয়েছে স্যার’ ইত্যাদি শুনে পুলিশ সুজনকে আর থানায় নিয়ে যায়নি। মামা তখন রেগে গিয়ে বলেন, “তুই এখুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা!” এই কথাটাই শুনতে চাইছিলো সুজন।

ট্রেনটা শিয়ালদা স্টেশনে এসে থামলো। খিদেটা এখন একেবারে অসহ্য হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি স্টেশনের বাইরে এসে রুটি আলুর দম খেয়ে নিলো সুজন। খাওয়ার পর খানিকটা জল খেলো ঢক ঢক করে। শরীর খাবার পেলে মনোবল বেড়ে যায়। এবার তাকে কাঞ্চনের বাড়িটা খুঁজে বার করতে হবে। (চলবে) 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199