দুনের রানি

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 21 Feb 2019

2085 বার পড়া হয়েছে

Shoes
এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক।বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

মনে পড়ে ১৯৪০ সালের দেরাদুনের কথা, আমি তখন ছোটো, জনসংখ্যা ছিলো চল্লিশ হাজারের মতো, সেটা আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষে। ঊর্ধ্বমুখ হয়ে প্রশ্ন করি ঈশ্বরকে, আজ থেকে আরো বিশ বছর পরে এই সংখ্যা কততে গিয়ে দাঁড়াবে?
জবাবে ঈশ্বর হেঁয়ালির আশ্রয় নেন: ‘কম্পিউটারের কাছ থেকে উত্তরটা বার করো গিয়ে, যাও।’
যেই সৃষ্টিকর্তা পৃথিবী ও তার বুকে চড়ে বেড়ায় এমন সবকিছুকে বানিয়েছেন, তাঁর জন্যও বোধ হয় মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির হারটা আতঙ্কিত হবার মতো একটা কিছু। অপরাপর প্রাণীর জীবন সংহার, বন ও বৃক্ষসম্পদ ধ্বংস করে তবে এই সংখ্যাবৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে, অথচ এসবই মানুষের জীবন রক্ষার বাহন ও সহায়ক হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে। ঈশ্বর ক্ষমাশীল, কিন্তু প্রকৃতিতো নয়। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছি আমরা নিজেদের বিনাশের ঝুঁকি নিয়েই।
ভাবতে কী অদ্ভুতই না লাগে যে পৃথিবীর এই ছোট্ট কোণটি, এই উপত্যকাটি আজ থেকে চার’শ বছর আগে মাত্র অল্পক’টি ছড়ানো ছিটানো গ্রামকে বুকে নিয়ে বিরাজ করছিল। ওগুলোকে আজো চেনা সম্ভব, যদিও গ্রামগুলো দেরাদুন শহরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে আজ। ষষ্টদশ শতকের শেষ ও সপ্তদশ শতকের শুরুটাতে দেরাদুন শাসন করেছেন একজন নারী- রানি কর্ণবতী। অনুমান করা হয় গাড়োয়াল রাজাদের পক্ষে তিনি দুনের শাসনভার নিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী কোনো এক আবজু কানওয়ার, নিজের নেপথ্য ভূমিকাতে তাঁর আপত্তি ছিলনা। পুরনো দলিল থেকে জানা যায় রানির প্রাসাদটি ছিল বর্তমান শহরের কয়েকমাইল দক্ষিণ-পূর্বে নাগসিদ্ধ পাহাড়ে অবস্থিত নওদা নামের এক জায়গায়। তাঁর রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল কাওলাগড়, কর্ণপুর, রাজপুর এবং কায়ারকুলি-এর গ্রামগুলো। কর্ণপুর আর কাওলাগড় অনেকদিন থেকেই শহরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। সপ্তদশ শতকের শেষদিকটাতে গুরু রামরাই-এর খুরবুরা দখলের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার শুরু। রাজপুর একটা বিচ্ছিন্ন পল্লি হিসেবে থেকে যায়। তবে ১৮২০ সালে ব্রিটিশরা মুসৌরি হিল-স্টেশন তৈরি করার সময় রাজপুর পরিণত হয় মুসৌরি যাওয়া আসার পথে এক মিলনস্থলে। কেবল কায়ারকুলি, দেরা বা মুসৌরিথেকে মোটামুটি স্বতন্ত্র থাকতে পেরেছে। মুসৌরির দিকে গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকলে আপনি রাজপুরকে দেখবেন কীভাবে শিরা ছড়িয়ে বসে আছে পাহাড় জুড়ে। এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও চুনাপাথরের খনি ক্যান্সারের মতো বিস্তার করে ছিল পুরো এলাকা।
রানি কর্ণবতী নিশ্চয়ই একজন অসাধারণ নারী ছিলেন তাঁর সময়ে। মূল রাজপুর খাল খননের কৃতিত্ব তাঁরই, পরে ব্রিটিশরা তাদের চা-বাগান ও লিচু-বাগানে জলসেচের জন্য সংস্কার করে সেসব খাল। এ্যাটকিনসন তাঁর গ্যাজেটিয়ারে লিখেছেন দুদাতলি পাহাড়-শ্রেণির বিনসার নামক চূড়ায় একটা শিবমন্দির রয়েছে। এই মন্দির সাত্ত্বিকতা ও অলৌকিকত্বর জন্য পাহাড়ের নিম্নতম অঞ্চল পর্যন্ত সবার কাছে দারুণভাবে পূজনীয় ছিল। এই স্থানটিতেই একবার দেবতারা রানির জীবন রক্ষা করেছিলেন তাঁকে তাঁর শত্রুদের হাত থেকে, তাদেরকে আকাশ থেকে শিলাবর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়ে। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে পরে তিনি মন্দিরটির জন্য নতুন একটা স্তম্ভ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।
বিনসারের ব্যাপারে জনশ্রুতি আছে যে এই শিবমন্দির থেকে বা মন্দিরে পূজারত ভক্তদের কাছ থেকে কেউ কিছু চুরি করলে কোনো অদৃশ্য শক্তি চোরাই মালের বিশগুণ ফেরতনা দেয়া পর্যন্ত চোরকে ধাওয়া করে ফেরে। বিনসারে এলে নাকি অবিশ্বাসী দুষ্টরাও শুধরে যায়।একারণেই বোধহয় একটা প্রবাদ আছে,‘ভাই, বিনসার কা লোহা জানলো সামাঝলো।’
লোকে আরো বলে যে যদিও আশেপাশের জঙ্গল বাঘে ঠাঁসা তবুও একটা বাঘ কখনো কোনো পূজারীকে এসে আক্রমণ করেনি-এসবই মন্দিরের কৃপা। তবে বিনসারের পথে বাঘ-দর্শনকে সুলক্ষণ বিবেচনা করা হতো। এই বিশ্বাসটা এখনো আছে, যদিও বাঘের সংখ্যা এখন এতটাই কম যে আগের দিনের চাইতে রাস্তাঘাটে বাঘের সামনে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বিশাল পাহাড়ি অঞ্চলে নারী-শাসনের বিষয়টা অস্বাভাবিক হলেও পশ্চিম গাড়োয়ালে কোনো কোনো এলাকায় কর্ণবতীর আগেও নারী শাসক ছিলেন। সপ্তম শতকের পরিব্রাজক হিউয়েন স্যাং তাঁর হিমালয় বিষয়ক ভ্রমণকাহিনীতে ব্রহ্মপুরা নামে এক রাজ্য উল্লেখ করেছেন। পরে জানা গেছে যে ব্রহ্মপুরা আসলে রাওয়াইন গাড়োয়ালের (এখনকার উত্তর কাশী) বারাহাত। সেখানে স্বর্ণ আহরিত হতো আর দীর্ঘকাল ধরে অঞ্চলটি নারীশাসিত, তাই ওর নাম ছিল নারীস্থান। শাসক নারীর স্বামীকে যদিও রাজা ডাকা হতো তথাপি রাজ্য পরিচালনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই ছিলনা। রাজার কাজ ছিল যুদ্ধ পরিচালনা ও চাষবাস দেখা।
এসব কাহিনীর দলিলী প্রমাণ তেমন নেই, তবে এটা বোঝা যায় যে নারী শাসন তখন কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিলনা। ওই অঞ্চলের সামাজিক বৈশিষ্ট সবসময়েই স্বাতন্ত্র বজায় রেখে আসছে।
মোটামুটি সেই সময়টাতে দুনের রানি কর্ণবতীর রাজ্যটাকে আমি কল্পনা করতে পারি- ছড়ানো ছিটানো গ্রাম, এখানে ওখানে চাষবাসের চিহ্ন, বনাঞ্চল পাহাড়ের তলা থেকে সুদূরে বিস্তৃত। বাঘ ও হাতি সহ আরো অনেক বন্য জন্তু বিচরণ করতো তখন, যেগুলো আজ লুপ্ত।
স্বভাবতই দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে অভিবাসন আকৃষ্ট করেছে স্থানটি, কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৮১৭ সালেও, যখন ব্রিটিশরা গুর্খাদের কাছ থেকে দুন কেড়ে নিয়েছে, তখনকার এক আদমশুমারিতে (ওয়ালটনস গ্যাজেটিয়ার) দেখা যায় যে দেরাদুনের জনসংখ্যা দুই হাজার একশ, আর ঘর-বাড়ির সংখ্যা পাঁচশ; আজকের বিচারে সেটাকে কোনো শহর বলা চলেনা।
বর্তমান জনসংখ্যা পাঁচলক্ষ। এথেকে বুঝুন গত পঞ্চাশ বছরে কী ব্যাপক হারে বেড়েছে জনসংখ্যা, হয়েছে নগরায়ণ।
সব সত্যি; তারপরও দুনের অনেক জায়গাই এখনো খুবই মনোরম। এই উর্বর উপত্যকায় যেকোনো বৃক্ষ বা ফুল সহজে জন্মায়। আশা করি বিংশ শতাব্দিতে পৌঁছাবার পরও হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মর জন্য কিছু বাগান, কিছু খোলা জায়গা থেকে যাবে।
দেরাদুন এখন উত্তরখন্ড্ প্রদেশের রাজধানী। সব পরিসংখ্যানেরই ঊর্ধমূখী সংশোধন দরকার হবে এখন। অঙ্কে কোনোকালে ভাল ছিলামনা, কাজেই নিশ্চিন্তে সব হিসাব কম্পিউটারের কাছে রাখছি। (চলবে)

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199