পার্সোনাল সার্ভিস পর্ব. ১১

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 8 Feb 2024

3735 বার পড়া হয়েছে

Shoes
দীপারুণ ভট্টাচার্য

এগারো.

বেশ কয়েকদিন ধরে প্রণতির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সুজন দারুণ ব্যস্ত হয়ে আছে একজন মানুষকে নিয়ে। এই কাজের সুবাদে অনেক মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় আর লেনদেন হয়েছে। কিন্তু এমন একজন মানুষ সে আজ পর্যন্ত দেখেনি। গত তিন মাস হয়ে গেল এই নতুন মন্ত্রী সাহেবকে বাগে আনা যাচ্ছে না। সরকারি জমি লিজের বিষয়। সপ্তাহ দুয়েক আগে কেসটা কাপুর সুজনকে দিয়েছে। সুজন সকাল বিকেল লেগে আছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। মন্ত্রী দেখাও করছেন না; আবার কাজও করছেন না। লোকটা সৎ না অসৎ সেটাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অসৎ মানুষদের হাত করা খুব সহজ। আবার যারা সৎ মানুষ, টাকা খায় না। তাদের সঙ্গে কাজ করাও তেমন কঠিন নয়। যেমন ধরা যাক, প্রনবেশ পাটনায়েকের কথা। অনেকদিন থেকেই ফাইলটা ঝুলে ছিলো। স্টেডিয়ামের টেন্ডার হয়েছে কিন্তু নানান কারণে সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। দুটো মিটিং করেই সুজন বুঝে গেলো এই লোক টাকা নেবে না। সে প্রস্তাব দিলো, “আপনার এলাকার জন্যে কি করতে পারি বলুন?” পাটনায়েক বাবু বললেন, “ব্লক হাসপাতালের অবস্থা খুব খারাপ। অনেক টাকা খরচ হবে। কিছু করতে পারেন কিনা দেখুন”। কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হলো, তারা ব্লক হাসপাতালটাকে নির্মীয়মাণ স্টেডিয়ামের প্রোজেক্টের সঙ্গে জুড়ে একসঙ্গে করবে কাজটা। এই কেসের পর থেকে কাপুর সুজনকে মানি ক্যারিয়ারের বাইরে অন্য কাজ দিতে শুরু করেছে। সুজনও এই অন্য ধরনের কাজ গুলোকে বেশি পছন্দ করে। টাকার থলি নিয়ে হোটেলের ঘরে বসে থাকা তার এখন বিরক্ত লাগে। ঐ কাজে রিস্কও অনেক বেশি।

মন্ত্রীর অফিসের বাইরে অপেক্ষা করছিলো সুজন। কখন ডাকবেন কে জানে। আদৌ কি ডাকবেন। এই ভাবেই রোজ দিন কাটছে। এমন ভাবতে ভাবতেই মন্ত্রীর পিয়ে কানু বাবুর ফোন এলো, “শুনুন অনেক বলে রাজি করেছি। দুই মিনিট সময়”।

-“যথেষ্ট। কোথায়?”

-“দুতলার বাথরুমে! দশ মিনিট পরে আসুন!”

ফোন ছেড়ে দিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো সুজন। দুই মিনিট সময়টা কোন বিষয় নয়। দুই মিনিটের মিটিং দুই ঘণ্টা হয়ে যায় সে জানে। কিন্তু বাথরুমে মিটিং, কেন! মন্ত্রীর সঙ্গে বাথরুমে ঢুকে কথা বলতে হবে এটা একেবারেই ভাল লাগছে না সুজনের। তাহলে কি সিসিটিভির থেকে বাঁচতে মন্ত্রী সাহেব এমনটা করছেন! সেটা যদি হয়, কাজ তাহলে হয়ে গেছে ধরে নিতে হবে। ভাবনার বিষয় হলো, বাথরুমে কথা সে শুরু করবে কিভাবে! বাথরুমের দুই মিনিট কখনই দশ মিনিট হবে না। তাছাড়া ঐ সময়ে অন্য কেউ যদি ঢুকে পড়ে!

এই রকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠলো আবার। ফোন করছে কাঞ্চন দা। এখন কাঞ্চনের সঙ্গে কথা বলতে তার ইচ্ছে করছে না। তবুও ফোনটা সে তুললো। মাঝে মাঝে একটা চিন্তা থেকে নিজেকে খানিকটা সরিয়ে আবার সেই চিন্তাতে প্রবেশ করাতে পারলে সমাধান ভালো হয়; সুজন দেখেছে। 

কাঞ্চনের গলায় উচ্ছ্বাস, “শোন, আগামী মাসের বাইশ তারিখ নাগারের শো’টা হবে। দেখ না যদি আসতে পারিস”।

-“কোন শো কাঞ্চন দা?”

-“সেদিন বললাম না, মাউন্ট শঙ্কর ভ্যানিস”।

-“হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ঠিক আছে দেখছি। এখন রাখি”। ফোন পকেটে রেখে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল সুজন।

মন্ত্রী সাহেব এলেন একদম সময় মেপে। সুজন সঙ্গে সঙ্গে তার পাশের ইউরিনালে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং ভূমিকা হীন ভাবে বললো, “প্রস্তাবটা স্যার আমি এখানেও দিতে পারি। কিন্তু সেটা কি আপনি পছন্দ করবেন?” দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে মন্ত্রী সাহেব নিচু কণ্ঠে বললেন, “প্রস্তাব কি নির্ধারিত না আলোচনা সাপেক্ষ?” এবার সুজন একটু হাসলো, “একেবারেই আপনার উপর নির্ভরশীল স্যার”।

-“তাহলে তো প্রস্তাব আমাকেই দিতে হয়”।

সুজন এবার কোন কথা খুঁজে পেলো না। চলে যাওয়ার আগে মন্ত্রী সাহেব বললেন, “১৭নং লাউডান ষ্ট্রীটে আজ রাত আটায় লোক থাকবে”।

এই লোকটাকে সুজন বুঝতে পারলো না। কাপুরকে পুরোটা বলতে সে বললো, “বেশি ভেবে লাভ নেই। দশ লাখ টোকেন দিয়ে কথা বলে নাও”। মনের মধ্যে কোথাও যেন খচখচ করতে লাগলো সুজনের। ১৭নং লাউডান ষ্ট্রীটে একটা নামকরা বার আছে। ওখানে কথা বলার থাকলে বাথরুমে ডাকার অর্থটা কি। মনে হচ্ছে কথা বলার জন্যে অন্য লোক আসবে। সেই লোক টাকা নেওয়ার পর যদি মন্ত্রী কাজটা না করেন তখন একটা ভুল বোঝাবুঝির বিষয় হবে। ইচ্ছা করেই খানিকটা লেট করে গেলো সুজন। বিরাট হল ঘর। সামনের মঞ্চে বসে গায়ক গজল গাইছেন। সঙ্গে তবলা আর সারেঙ্গী। সুন্দর পরিবেশ। ছোট বড় টেবিল রয়েছে পরপর। সুজন লক্ষ করলো তার ডানদিকের তৃতীয় টেবিলে বসে থাকা দুইজনের হাতে কোন গ্লাস নেই। টেবিলও খালি। একজন সাদা জামা পরে এসেছে অন্যজন ছাই রঙের। সে কাছে গিয়ে বললো, “আমি কি এখানে বসতে পারি?”

সাদা জামা বললো, “আপনি কি একা?”

-“হ্যাঁ”।

-“তাহলে বসুন”।

-“আমি কি আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি”।

-“বলুন না, আমরা তো শুনতেই এসেছি”।

একটু খটকা লাগলো সুজনের। যারা লেনদেনের জন্যে আছে তারা এই ভাবে কথা বলে না। এ যেন কথার জালে জড়িয়ে ফেলার ফন্দি। তবুই কথা তাকে চালিয়ে যেতেই হবে। মূল প্রসঙ্গে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ছাই রঙের জামা পরা লোকটা বললো, “একটু বুঝিয়ে বলুন তো। ধীরে ধীরে গুছিয়ে বলবেন সবটা”। ঠিক তখন সুজনের চোখ পড়লো, লোকটার চশমার কালো ফ্রেমের মাঝখানের জায়গাটা চিকচিক করছে। তার অভিজ্ঞ চোখ মুহূর্তে বুঝে নিলো, সেটা লুকানো ক্যামেরা ছাড়া কিছুই নয়। সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি খেলে গেলো সুজনের মাথায়। বললো, “আমার চোখের দিকে তাকান, সব বলছি”। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্মোহনীর যাদুতে দুইজনের চোখ ভারী হয়ে উঠলো। আর সেই সুযোগে তিন লাফে রাস্তায় নেমে এলো সুজন। তারপর ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে যেতে যেতে দেখলো একটা পুলিশের গাড়ি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐ দুটোই পুলিশের লোক। মন্ত্রীর উদ্দেশ্য ছিলো তাকে ধরিয়ে দিয়ে নিজের ইমেজ বানিয়ে নেওয়া। ঘুষ দিতে আসা একজনকে ধরিয়ে ইমেজ বানাও তারপর সেই ইমেজের আড়ালে যত পারো ঘুষ খাও। লোকটা অন্য কোন কোম্পানির সঙ্গে মনে হয় জমি লিজের ব্যাপারটা ফাইনাল করে ফেলেছে। এই মন্ত্রীকে দিকে কাজ হবে না। কেসটা আজই কাপুরকে ফেরত দিতে হবে। তিনবার ট্যাক্সি বদলে বাড়ি ফিরে এলো সুজন। বাড়িতে ফিরে সে হাফ ছেড়ে বাঁচল। পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠলে এই কাজে কদর কমে যায়। আবার এটাও সত্য পুলিশের খাতায় নাম উঠলে এই কাজ সে কোন দিন ছাড়তে পারবে না। (চলবে)

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199