পার্সোনাল সার্ভিস পর্ব. ৩

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 13 Dec 2023

4490 বার পড়া হয়েছে

Shoes
দীপারুণ ভট্টাচার্য

তিন.

অনেক চেষ্টা করেও গত দুই সপ্তাহে কোন কাজ পায়নি সুজন। একদিন সে কাঞ্চনের সঙ্গে একটা ম্যাজিক শো’তে গিয়েছিলো। কাঞ্চন খেলা দেখায় দারুণ। তবে তার পসার নেই। যোগাযোগ না থাকলে শো পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও লোক হয় না। কৃষ্ণনগরে ভোলানাথ দাসের বিরাট নাম ছিলো। মেলায় তার খেলা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে লোক আসতো। কিন্তু পয়সা তেমন রোজগার হতো না। ভোলানাথের সেরা খেলা ছিলো সম্মোহন। সুজন শুনেছে একবার খোলা মাঠে সম্মোহনের খেলা দেখাচ্ছিলেন ভোলানাথ। একটা গোটা নৌকা খেয়ে ফেলার খেলা। মাঠে বসে থাকা একদল সম্মোহিত জনতা দেখলো নৌকাটা যাদুকরের মুখের মধ্যে চলে গেলো আবার বেরিয়ে এলো ধীরে ধীরে। সেই সময় মাঠের বাইরের নারকেল গাছে উঠছিলো এক লোক। তামাশা দেখে সে চিৎকার করে বললো, “তুমি নৌকার কোণাটা কামড়ে ছিলে, খাওনাই; আমি দেখেছি”। ভোলানাথ সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বললো, “ওরে, তোর কোমরে সাপ”। লোকটা কোমরের দিকে তাকালো। হ্যাঁ, গামছা নয়, একটা সাপ তাকে জড়িয়ে রয়েছে। ভয় পেয়ে সে হুড়মুড় করে পড়লো মাটিতে।

এই ভোলানাথ মরার আগে ছেলেকে শিখিয়েছিল সম্মোহন বিদ্যা। তাই দিয়েই দুটো করে খাচ্ছে কাঞ্চন। সুজন ভেবেছিলো কাঞ্চনের দলে তারও একটা কাজ মিলবে। সে আশা তার ভেঙ্গে গেছে। যাদুকরের জমকালো পোশাক আর রোজগারের মধ্যে কোন মিলই নেই। নিভা এখন তাকে রোজ কথা শোনায়। কাঞ্চন ও সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেয়। কিছুদিন আগে হায়াত খাঁ লেনের এক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে সুজন একটা কাজ পেয়েছিলো। মালিক নীরজ ভাটিয়া, তাকে যে মাইনে দিতে চেয়েছিলো সেটা সুজনের একেবারেই পছন্দ হয় নি। বলেছিলো, “ভেবে জানাচ্ছি”। আজ সুজন রাজি হয়ে গেলো। কাঞ্চনদের দুটো বাড়ি পরেই থাকেন নারায়ণ রায়। চারতলায় তার চিলেকোঠার ঘরটা খালিই ছিলো। সুজন সেখানেই একার সংসার পেতে ফেললো।

কুরিয়ার সার্ভিসের কাজে খুব পরিশ্রম। সেই হিসাবে রোজগার নেই। দেখতে দেখতে অনেকগুলো মাস কেটে গেলো। বীথির সঙ্গে এখন ফোনে কথা হয়। চিলেকোঠার ঠিকানায় বীথি চিঠি-পত্র দেয় মাঝে মাঝে। সুজন চিঠি লেখে না। নিজের কাজ নিয়েও বীথির সঙ্গে লজ্জায় কথা বলতে পারে না। কোলকাতায় এসে সে কুরিয়ার ডেলিভারির কাজ নিয়েছে শুনলে বীথির ভালো লাগবে না। সুজন এখন কাজ করে আর নতুন কাজ খোঁজে। তবে নতুন কাজ পাওয়া সহজ নয়। রাজাবাজারের সুলেমানের নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে চিঠি আসে। এমন কি বিদেশ থেকেও। অথচ সুলেমানের অফিস দেখে কিছুই বোঝা যায় না। একদিন সুলেমান সুজনকে বললো, “এই কাজে কত রোজগার হয়?”

-“একার চলে যায়!”

-“বেশি রোজগারের ইচ্ছা থাকলে জানিও। তোমার জন্যে কাজ আছে”।

সুজন বেশি না ভেবেই রাজি হয়ে গেলো। পার্সেল সাপ্লাইয়ের কাজ। সপ্তাহে একটা করে পার্সেল তাকে সুলেমানের থেকে নিয়ে পৌঁছে দিতে হয় পার্টিকে। আবার পার্টির থেকে টাকা নিয়ে সুলেমানের কাছে। কিছুদিন যেতে না যেতেই সুজনের কাছে দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। পার্সেলের মধ্যে নেশার জিনিস থাকে। নইলে এতো টাকা সার্ভিস চার্জ সুলেমান তাকে দিতে পারতো না। যেসব জায়গাতে সে পার্সেল পাঠায়, সেই জায়গা গুলোও অন্য রকম। দ্বিতীয় বিষয়টা হল, ভাটিয়া জি’র সঙ্গে সুলেমানের একটা যোগাযোগ আছে। এই কুরিয়ার অফিসের আরও কয়েকজন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত।

নিউ আলিপুরের এই বাড়িটাতে সুজন আগেও কয়েকবার এসেছে। বাড়ির নিচে একটা বার। তবে তাকে পিছন দিকের গেট দিয়ে ঢুকে সোজা চারতলায় উঠে যেতে হয়। চার তলার গেটের পাশে খাটিয়া পেতে একটা দরোয়ান গোছের লোক সারাক্ষণ ঘুমায়। মনে হয় এই লোকটা রাতে কাজ করে। সুজন একেই পার্সেলটা দেয়। ভিতরে গিয়ে লোকটাই টাকা নিয়ে আসে। আজ সে সুজনকে বললো, “আপনাকে ভিতরে ডাকছে”। ভিতরে গিয়ে তাক লেগে গেলো সুজনের। এমন তো সে সিনেমায় দেখেছে। এখানে কি নাইট ক্লাব চলে! এখন দুপুর বলে, ফাঁকা। বছর চল্লিশের এক সুন্দরী এসে বললেন, “তুমি কি পার্সেলের টাকা নিয়েই চলে যাবে, না আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ থাকবে?” এক মুহূর্তে সুজনের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। সে বললো, “আমার বাবা হাসপাতালে। বিকেলে অপারেশন আছে। বললে, আমার এক বন্ধুকে পাঠিয়ে দিতে পারি”। একথা শুনে টাকার বান্ডিল দুটো টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে মহিলা বললো, “বাহাদুর, দরজা বন্ধ করে দে!”

বীথির সঙ্গে আজকাল ফোনে কম যোগাযোগ হয়। নিজের কাজের বিষয়ে প্রায় কিছুই তাকে বলতে পারেনি সুজন। একটা কুরিয়ার ডেলিভারি ম্যানের সঙ্গে বীথির বাবা কোন দিন তার বিয়ে দেবে না। বীথির চিঠি গুলো সুজন পড়ে আর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার জীবনও কি তাহলে ধীরে ধীরে অন্ধকারেই ডুবে যাচ্ছে! সুজন ঠিক করে পরিচিত পরিবেশ থেকে তাকে পালাতে হবে। এখানে সে মোটেই নিরাপদ নয়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রায় বাবুর চিলেকোঠা ছেড়ে সে পরেরদিন ঘর নেয় বেলেঘাটায়। নিজের ঝামেলায় কাঞ্চনকে জড়িয়ে লাভ নেই। আগে সে কাঞ্চনের সঙ্গে মাঝে মধ্যে যাদুর শো’তে যেতো। এখন আর সে সব হয় না। বেলেঘাটায় কয়েক মাস কাটতে না কাটতেই সুজন নিজের বাইক কিনল। সুলেমান এখন তাকে সপ্তাহে দুটো থেকে তিনটে কাজ দেয়। সাধারণ কুরিয়ারের কাজে সে ধীরে ধীরে উৎসাহ হারাচ্ছে।

আজ সুজন একটু সকাল সকালই বেরিয়ে পড়লো। তাকে কাঞ্চন ডেকেছে। কি যেন কথা আছে। তার আগে একবার নিউ আলিপুরে যেতে হবে। গতকাল সন্ধেবেলা সে পার্সেল তুলেছে সুলেমানের থেকে। বাড়ির সামনে বাইকটা থামাতে গিয়ে হঠাৎ কি যেন মনে করে একটু এগিয়ে গেল সুজন। ঠিকই ধরেছে; কোনায় একটা পুলিশের গাড়ি ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশের সিগারেট দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো সে। দোকানদার পান বানাচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে সে নিচু গলায় বললো, “গালিতে পুলিশ কেন?” দোকানদার আরও নিচু স্বরে বললো, “চারতলায় রেড হয়েছে। আমরা ভাবতাম নিচে বার, তাই এতো লোক। এখন তো শুনছি অন্য কারবার”। সুজন আর দাঁড়াল না। সুলেমানেকে মালটা ফেরত দিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু রাজাবাজারে এসে সে দেখলো সুলেমানের গলিতে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। সব জায়গায় কি এক সাঙ্গে রেড হচ্ছে! তার ব্যাগে পার্সেলটা রয়েছে। ধরা পড়লে সর্বনাশ। সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি মাথায় খেলে গেলো। সল্টলেকের করুণাময়ীর কাছে এক পার্টি আছে। আগামী কাল তাকে মাল দেওয়ার কথা। একদিন আগে দিলে কি নেবে না! সুজন বাড়িটার চারিদিকে দুবার চক্কর মেরে বুঝলো, এখানে কোন অসুবিধা নেই। মাল নিয়ে লোকটা বললো, “আমি তো আজ চাইনি!”

-“কাল আমার বাবার একটা অপারেশন আছে তাই সুলেমান ভাই বললো

-“তাহলে টাকার জন্যে একটু বসতে হবে”।

-“এখন আর বসছি না। বিকেলের দিকে আসবো আবার” সুজন বেরিয়ে পড়লো।

দুপুরের খাওয়া জুটলো কাঞ্চনের বাড়িতে। নিভা বৌদি যত্ন করে খেতে দিলো। বহুদিন বাড়ির খাবার খায়নি সুজন। কাঞ্চন দা কে বেশ খুশি খুশি লাগছে। বললো, “একটা বড় কাজ পেয়েছি। উত্তর প্রদেশের অনেকগুলো শহরে পরপর শো। মাস দুয়েকের ব্যাপার। তুই সঙ্গে থাকেলে একটু ভরসা পাই। যাবি নাকি আমার ম্যানেজার হয়ে?” সুজন হাসতে হাসতে বললো, “কত মাইনে দেবে?”

-“তোর কত চাই?”

-“হিপনোটিজমটা শেখালে বিনা পয়সাতেও যেতে পারি!”

-“ওটা শিখে তুই কি করবি?”

-“তোমার ভাত মারতে যাবো না। এটুকু কথা দিতে পারি”।

বিকেলে কুরিয়ারের অফিসে এসে একটা ঝামেলায় পড়ে গেলো সুজন। নিমাই নামের ছেলেটা আজ কোকেন সহ ধরা পড়েছে। তাকে জেরা করেই সুলেমানের বিভিন্ন ডেরায় পুলিশের দাপাদাপি শুরু হয়েছে। সুজনকে থানার ডেকে দু’ঘণ্টা জেরা করলো পুলিশ। সন্দেহ জনক কিছুই পাওয়া গেলো না। সন্ধেবেলা থানা থেকে বেরিয়ে সুজন ঠিক করলো, এই পথে আর নয়। মোবাইলের সিম কার্ডটা বার করে ফেলে দিল রাস্তায়। তারপর একে একে বাকি কাজ মিটিয়ে পরদিন দুপুরের গাড়িতে কাঞ্চনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল উত্তর প্রদেশের উদ্দেশ্যে। (চলবে)

ছবি: গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199