আমার মনের ভিতরে একটা ট্রেন আছে

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 7 Apr 2024

2945 বার পড়া হয়েছে

Shoes

জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় লিখেছেন,

‘‘কেন আমি পিছে ফেলে যাই তোমাদের এই ট্রেন-এই রাত

এই হিম-এ কি আমি চাই!’’

ট্রেনের আসা এবং যাওয়ার সঙ্গে কেমন এক বিষাদ লেগে থাকে। ট্রেন এসে কিছু হাসি, আনন্দ আর ব্যস্ততা নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। সেই যাওয়ার পেছনে পড়ে থাকে বিষাদ। সারাদিন স্টেশনে বাদামের ঠোঙ্গা ওড়ে, ওড়ে ছেঁড়া কাগজ, দিনের বাসি পত্রিকা পড়ে থাকে বেঞ্চিতে। একটা ট্রেন চলে যাওয়া মানে, অনেকগুলো গল্প বিদায় নেয়া। তখন শুধু পড়ে থাকে স্মৃতি। পোড়ায় মনে পড়ার আগুন।ট্রেনের কামরাও ধরে রাখে অনেক গল্প। গতিবেগের সঙ্গে গল্পগুলিও ছোটে মানুষের সঙ্গে। তারপর এক সময় উদাস বাঁশি বেজে ওঠে। ট্রেন থামে। কামরার ভিতরে জমে ওঠা গল্প হারায় বিচ্ছেদে।

ট্রেনের চলে যাওয়া এক গলা কাশবনে দাঁড়িয়ে দেখেছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর অপু-দূর্গা। সেই বিষ্ময়, সেই আনন্দের স্মৃতি বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের আবিষ্ট করে রেখেছে আজও। সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণের উপন্যাসের ট্রেনকে বাঁধলেন সেলুলয়েডে। কাশবনের ভিতর দিয়ে দুই ভাইবোনের ছুট আর দূর ফ্রেমে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাওয়া ট্রেন আরেকবার যেন পথের পাঁচালীকে অমরত্ব দিলো।

কবি আবুল হাসান লিখেছেন, ‘রাত্রিবেলা ট্রেনের বাঁশি/ শুনতে আমার খারাপ লাগে।

ট্রেনের হুইসেল, সিটি কবির কবিতায় বাঁশি হয়ে যেতেই মনের মধ্যে বেহাগের সুর বেজে ওঠে। মনে হয়, কোথাও বিসর্জন, কোথাও বিদায় আমাদের জীবনের গল্পের পথে জেগে উঠছে। রেলগাড়ি বাহনটাই আসলে মনের মধ্যে বিচ্ছেদের অনড় প্রতীকের মতো বসে থাকে। আর এই সুযোগটাকেই পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছেন। কাজে লাগিয়েছেন চলচ্চিত্রের পরিচালকরা। কবিতা, উপন্যাস, গল্প আর সিনেমায় রেলগাড়ি নিজেই এক চরিত্র হয়ে উঠেছে।

গোয়েন্দ গল্পের প্রখ্যাত লেখক আগাথা ক্রিস্টির ‘মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ উপন্যাসে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে ঘটে যাওয়া এক লোমহর্ষক খুনের কিনারা করেন গোয়েন্দা এরকুল পয়রো। সেখানে ট্রেনটাও হয়ে ওঠে গা ছমছম করা এক চরিত্র।এই রহস্যকাহিনি অবলম্বনে তৈরি হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্রও। একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিক পলা হকিন্সের ‘গার্ল ইন দ্য ট্রেন’ বইতে একটি মেয়ে সেই ট্রেনের জানালা থেকে দূরে একটি বাড়িতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর এক ঘটনা দেখে ফেলে। শুরু হয় উত্তেজনাময় এক থ্রিলার কাহিনি। তবে থ্রিলার অথবা গোয়েন্দা গল্পের উত্তেজনার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে যায় রুশ কথাসাহিত্যিক লিও টলস্টয়ের ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাস। সেখানে আনা নামের সেই কেন্দ্রীয় চরিত্রের নারীটি শেষে চলন্ত ট্রেনের তলায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। টলস্টয়ের লেখা গোটা উপন্যাসে ট্রেন, রেললাইন আর স্টেশনের প্রসঙ্গ অসংখ্যবার এসেছে কাহিনির অনুসঙ্গ হয়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টলস্টয় নিজে রেলগাড়ি নামক বাহনটিকে ভালোবাসতেন না। একটি লেখায় তিনি রেললাইকে বেশ্যার মতো ভালোবাসার কথা লিখেছেন। সাহিত্যের আলোচকরা বলেন, টলস্টয় আসলে ট্রেনকে প্রযুক্তির এক নির্দয় শক্তি হিসাবে তার উপন্যাসে উপস্থিত করতে চেয়েছেন যা শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে।

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে আবারও রেলের কামরায় থমকে যায় নিজেদের প্রকাশে ব্যর্থ দু‘জন নারী-পুরুষ। একজন সিনেমার প্রখ্যাত নায়ক অন্যজন সুন্দরী, বিদূষী নারী। এক ট্রেন ভ্রমণের ভিতর দিয়ে তাদের মধ্যে প্রেমের স্রোত তৈরি হয় আবার সেতুর অভাবে গন্তব্যের স্টেশনে মুখ থুবড়ে পড়ে। ছিঁড়ে যায় সূত্রপাতের গল্প। হাওয়ায় চিরকালের জন্য উড়ে যায় ঘুড়ি। অসাধারণ এক সিনেমার গল্পে ট্রেন এসে দাঁড়ায় খল নায়কের ভূমিকায়।

লেখার শিরোনামটি কবি আল মাহমুদের একটি সাক্ষাৎকার থেকে নেয়া। তাঁর ‘পিপাসার বালুচর’ কবিতাগ্রন্থে ট্রেন ভ্রমণের ওপর নির্ভর করে গঠিত হয়ে উঠেছে কবিতা। সেখানেই তিনি লিখেছেন, ‘‘আমার ভিতরে একটি ট্রেন আছে’’। সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেছেন, ‘ট্রেনের বাঁশি শুনলেই আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে, শৈশবের কথা মনে পড়ে।’

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199